নামাজের বিধি-বিধান [2]

                নামাজের বিধি-বিধান :-2







ইসলামের দৃষ্টিতে চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করার বিধি-বিধান :

বর্তমানে প্রায় সব মসজিদেই অনেক মুসল্লিকে চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করতে দেখা যায়। কিন্তু শরিয়তের বিধান অনুযায়ী চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করাটা সঠিক হচ্ছে কিনা সেটা তাদের অনেকেই জানেন না। অনেকের উজর-সমস্যা এতই মামুলি যে, এ ধরনের সমস্যার কারণে চেয়ারে
বসে নামাজ আদায় করাটা বৈধ হয় না, ফলে তারা যখন চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করেন তখন তা সহি হয় না। একটু কষ্ট করে চেয়ার ছাড়াই তারা নামাজ আদায় করতে পারেন কিন্তু তারা সেটা না করে বরং চেয়ারে বসেই নামাজ আদায় করে যাচ্ছেন। আর নামাজ আদায় করা সত্ত্বেও নামাজ
সহি না হওয়ার কারণে তারা গোনাহগার হচ্ছেন। এজন্য এ সংক্রান্ত মাসআলা-মাসাইল বিজ্ঞ মুফতিদের সঙ্গে কথা বলে জেনে নেয়া একান্ত জরুরি। যাতে ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নামাজ সহি-শুদ্ধ হয়। বক্ষমান নিবন্ধে সংক্ষেপে বিষয়টি আলোচনা করার প্রয়াস
পাব।
* কিয়াম তথা দাঁড়ানো নামাজের একটি ফরজ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে তোমরা নামাজের প্রতি যত্নবান হবে। বিশেষত মধ্যবর্তী নামাজের প্রতি এবং আল্লাহর উদ্দেশে তোমরা বিনীতভাবে দাঁড়াবে। (বাকারা : ২৩৮)।
এ আয়াতে নামাজে দাঁড়ানোর কথা বলা হয়েছে। (বাদায়েউস সানায়ে ১/২৮৭)। দাঁড়াতে সক্ষম হলে ফরজ, ওয়াজিব ও ফজরের সুন্নাত নামাজ দাঁড়িয়েই আদায় করতে হবে। এসব নামাজ বসে আদায় করলে সহি হবে না। (শামী ২/৫৬৫)। নফল নামাজ দাঁড়াতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও বসে আদায়
করা জায়েজ। (শামী বৈরোত, ২/৫৬৫)। তবে তাতে দাঁড়ানোর তুলনায় অর্ধেক সওয়াব হয়। বিষয়টি একটি হাদিসে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। হজরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.) কে বসে নামাজ আদায় করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। রাসূল
(সা.) বললেন, কেউ যদি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করে তাহলে তা তার জন্য উত্তম। আর বসে নামাজ আদায় করলে সে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করার অর্ধেক সওয়াব পাবে। (বুখারি ১/১৫০ তিরমিযী ১/৮৫)। এ হাদিসটি নফল নামাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ দাঁড়াতে সক্ষম হলে ফরজ
ওয়াজিব নামাজ বসে আদায় করা জায়েজ নয়। ইমাম তিরমিযী জামি তিরমিযীতে হাদিসটি উল্লেখ করার পর লিখেন, কতক আলেম এ হাদিসটির মর্ম সম্পর্কে বলেছেন, এটি নফলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হাসান বসরি থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, কেউ ইচ্ছা করলে দাঁড়িয়ে বসে শুয়ে নফল
নামাজ আদায় করতে পারবে। ‘বসে নামাজ আদায় করলে দাঁড়িয়ে আদায় করার তুলনায় অর্ধেক সওয়াব হবে’ এ হাদিসটির ব্যাখ্যায় সুফিয়ান সাওরি বলেন, যে ব্যক্তি সুস্থ, যার কোনো উজর-সমস্যা নেই এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে হাদিসটি প্রযোজ্য। অর্থাৎ নফল নামাজের ক্ষেত্রে
কেউ কোনো অসুস্থতা বা উজরের কারণে বসে নামাজ আদায় করলে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ের সমান সওয়াবই পাবে। সুফিয়ান সাওরির এ বক্তব্যের মতো বক্তব্য কিছু হাদিসেও পাওয়া যায়। (তিরমিযী ১/৮৫)। হজরত হাফসা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) এর ইন্তিকালের এক বছর আগ পর্যন্ত
আমি তাকে নফল নামাজ বসে আদায় করতে দেখিনি। ওফাতের এক বছর আগে তিনি (মাঝে মাঝে) নফল নামাজ বসে আদায় করতেন। সূরা পড়তেন স্পষ্ট করে। ধীরে ধীরে। কেরাত হতো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। (তিরমিযী ১/৮৫)। দাঁড়াতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও নফল নামাজ বসে পড়লে জমিনে
বসেই পড়তে হবে। চেয়ারে বসে পড়লে নামাজ সহি হবে না। জমিনে বসে হাঁটু বরাবর মাথা ঝুঁকিয়ে রুকু করতে হবে। সিজদা করতে সক্ষম হলে জমিনেই সিজদা করতে হবে। (খানিয়া ১/১৭১)।
যিনি দাঁড়াতে সক্ষম কিন্তু নিয়ম মতো রুকু সিজদা করতে অক্ষম, রুকু সিজদা করতে মারাত্মক কষ্ট হয় বা রোগ বেড়ে যায় অথবা রোগ সারতে বিলম্ব হবে এ ধরনের লোক দাঁড়িয়ে ইশারায় রুকু সিজদা করে নামাজ আদায় করবেন। জমিনে বা চেয়ারে বসে নামজ আদায় করলে নামাজ সহি
হবে না। কারণ, নামজে কিয়াম বা দাঁড়ানো একটি ফরজ, অপারগতা ছাড়া তা বাদ দিলে নামজ সহি হবে না। (বদায়েউস সানায়ে ১/১০৭, মাজমাউল আনহুর ১/২২৯, তাবইনুল হাকায়েক ১/৪৯২)।
* কেউ যদি কোনো কিছুর ওপর ভর করে, হেলান দিয়ে টেক লাগিয়ে দাঁড়াতে পারেন সোজা দাঁড়াতে পারেন না তাহলে তিনি কিছুর ওপর ভর করে ঠেক লাগিয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করবেন। জমিনে বা চেয়ারে বসে ফরজ ওয়াজিব ও ফজরের সুন্নাত নামজ আদায় করলে সহি হবে না। (ফাতহুল
কাদির ২/৩, শামী বৈরোত ২/৫৬৭)।
* যিনি কিছুক্ষণ দাঁড়াতে পারেন বেশি সময় দাঁড়াতে পারেন না। তিনি দাঁড়িয়ে নামাজ শুরু করবেন। যতক্ষণ সম্ভব দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করবেন। যখন কষ্ট হবে জমিনে বসে বাকি নামাজ আদায় করবেন। রুকু সিজদা নিয়ম মতো করবেন। এমতাবস্থায় চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করলে
নামাজ সহি হবে না। যেমন একজন মানুষ দীর্ঘ সময় দাঁড়াতে পারে না, ফজরের নামাজে দীর্ঘ কেরাত পড়া হয় তিনি যদি জামাতে ফজরের নামাজ আদায় করেন তাহলে দাঁড়িয়ে শুরু করবেন যতক্ষণ সম্ভব দাঁড়াবেন। যখন কষ্ট হবে, জমিনে বসে পড়বে। চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করতে
পারবেন না। ( ফতাহুল কাদির ২/৩। শামী বৈরোত ২/৫৬৭।
* যারা দাঁড়াতে এবং রুকু সিজদা করতে অক্ষম, তারা জমিনে যেভাবে বসতে সক্ষম সেভাবে বসেই নামাজ আদায় করবেন। চেয়ারে বসে আদায় করলে নামজ সহি হবে না। জমিনে বসে ইশারায় রুকু সিজদা করতে হবে। হাঁটু বরাবর মথা ঝুঁকিয়ে ইশারায় রুকু এবং আরেকটু বেশি ঝুঁকিয়ে
সিজদা করতে হবে। (বদায়েউস সানায়ে ১/২৮৪)। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে যারা দাঁড়িয়ে বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে এবং বলে হে আমাদের প্রতিপালক তুমি এটা অনর্থক সৃষ্টি করোনি। তুমি পবিত্র,
আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা কর। (আলইমরান, ১৯১)। কুরতুবি বলেন, হাসান বসরিসহ আরও কয়েকজন মুফাসসির বলেছেন, আয়াতটি নামাজ সম্পর্কে অর্থাৎ (বুদ্ধিমান তারা) যারা নামাজ নষ্ট করে না। উজর হলে বসে বা শুয়ে হলেও নামাজ আদায় করে। সুতরাং আয়াত
থেকে জানা গেল, নামাজ দাঁড়িয়ে আদায় করতে হবে। দাঁড়াতে সক্ষম না হলে বসে এবং তাও সম্ভব না হলে শুয়ে নামাজ আদায় করতে হবে। (তাফসিরে কুরতুবি ৪/১৯৮)। মাবসূতে সারাখসিতে রয়েছে, অসুস্থ ব্যক্তির নামাজের ব্যাপারে মূলনীতি হচ্ছে এ আয়াত- ‘যারা দাঁড়িয়ে
বসে এবং শুয়ে আল্লাহর স্মরণ করে’ (আল ইমরান ১৯১)। এ আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে যাহহাক বলেন, আয়াতটি হচ্ছে, অসুস্থ ব্যক্তির সামর্থ্য অনুযায়ী নামাজ আদায়ের বিবরণ। (মাবসূতে সারাখসি ১/২১২)। অপর একটি আয়াতে রয়েছে, ‘দাঁড়িয়ে বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ
করবে। (নিসা : ১০৩)। এ আয়াতে আল্লাহকে স্মরণ করার যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তার দ্বারা উদ্দেশ্য নামাজ। অর্থাৎ তোমরা নামাজ আদায় কর। (বাদায়ে ১/২৮৪)। একটি হাদিসে বিষয়টির সুস্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়। হজরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) বলেন, রাসূল (সা.)
কে অসুস্থ ব্যক্তির নামাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করবে। তা সম্ভব নাহলে বসে আদায় করবে। তাও সম্ভব না হলে শুয়ে নামাজ আদায় করবে। (বুখারি ১/১৫০, তিরমিযী, ১/৮৫, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ)। এ হাদিস দ্বারা সুস্পষ্ট
বুঝে আসে, দাঁড়ানো সম্ভব না হলে তখনই কেবল বসে নামাজ আদায় করা যাবে। যতক্ষণ পর্যন্ত দাঁড়ানো সম্ভব ততক্ষণ জমিনে বা চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করলে সহি হবে না। উজরের কারণে হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজে ফরজ নামাজও বসে আদায় করেছেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে
বর্ণিত। তিনি বলেন, যে অসুস্থতায় রাসূলে (সা.) ইন্তেকাল করেন সে অসুস্থতার সময় তিনি আবু বকর (রা.) এর পেছনে বসে নামাজ আদায় করেছেন। (মুসলিম, ১/১৭৭, তিরমিযী ১/৮৩)।
* যিনি জমিনে স্বাভাবিকভাবে বসতে পারেন না কিছুর সঙ্গে ঠেক লাগিয়ে বসতে পারেন তিনি কোনো কিছুর সঙ্গে ঠেক লাগিয়ে জমিনে বসেই নামাজ আদায় করবেন। যেমন মসজিদের পিলার, দেয়াল, ফ্লাটচেয়ার বালিশ ইত্যাদির সঙ্গে ঠেক লাগিয়ে জমিনে বসেই নামাজ আদায় করবেন। চেয়ারে
বসে আদায় করলে নামজা সহি হবে না। (শামী ২/৫৬৫)।
* হাঁটুতে সমস্যার কারণে অনেকে হাঁটু ভাঁজ করতে পারেন না। এ ধরনের লোকের পক্ষে যদি পশ্চিম দিকে পা ছড়িয়ে জমিনে বসে সম্ভব হয় তাহলে তারা সেভাবেই নামাজ আদায় করবেন। যদি তাও সম্ভব না হয়, কোনোভাবেই তারা জমিনে বসতে না পারেন তাহলে তখনই কেবল চেয়ারে বসে
নামাজ আদায় করা যাবে। তখন চেয়ারে বসে ইশারায় রুকু সিজদা করে নামাজ আদায় করবেন। সিজদার জন্য রুকুর তুলনায় অধিক মাথা ঝুঁকাতে হবে। যদি কেউ কোনোভাবেই বসতে না পারেন তাহলে তিনি চিৎ হয়ে শুয়ে নামাজ আদায় করবেন। পশ্চিম দিকে পা ছড়িয়ে দেবেন। ইশারায় রুকু
সিজদা করবেন। যদি সম্ভব হয় তাহলে পশ্চিমদিকে পা না দিয়ে বরং হাঁটু সোজা করবেন এবং মাথার নিচে বালিশ দিয়ে দেবেন। যাতে অন্তত কিছুটা বসার মতো হয় এবং চেহারা আকাশের দিকে না হয়ে কিবলামুখী হয়। (শামী, বৈরোত, ২/৫৬৯)।
সারকথা
রুকু সিজদা করতে অক্ষম ব্যক্তি দাঁড়াতে সক্ষম হলে দাঁড়িয়ে ইশারায় রুকু সিজদা করে নামাজ আদায় করতে হবে। দাঁড়াতে অক্ষম হলে জমিনে বসা সম্ভব হলে জমিনে বসেই নামাজ আদায় করতে হবে। চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করলে সহি হবে না। যিনি কোনোভাবেই জমিনে বসতে পারেন
না তিনি চেয়ারে বসে ইশারায় রুকু সিজদা করে নামাজ আদায় করবেন।

                     ________###________



একনজরে নামাজে সুরা - কিরাতপাঠের বিধি-বিধান :-



ইমাম হলে ফজরে এবং মাগরিবে ও ঈশার প্রথম দুই রাকাআতে উচ্চৈস্বরে কিরাত পড়বে এবং শেষ দুই রাকাআতে অনুচ্চৈস্বরে পড়বে। এটাই পরস্পরায় চলে এসেছে। আর যদি মু্নফারিদ হয় তা হলে সে ইচ্ছাধীন। চাইলে সে উচ্চৈস্বরে পাঠ করবে এবং নিজকে শোনাবে। কেননা নিজের ব্যাপারে
সে নিজের ইমাম। আর চাইলে চুপে চুপে পাঠ করবে।
ইমাম হলে ফজরে এবং মাগরিবে ও ঈশার প্রথম দুই রাকাআতে উচ্চৈস্বরে কিরাত পড়বে এবং শেষ দুই রাকাআতে অনুচ্চৈস্বরে পড়বে। এটাই পরস্পরায় চলে এসেছে। আর যদি মু্নফারিদ হয় তা হলে সে ইচ্ছাধীন। চাইলে সে উচ্চৈস্বরে পাঠ করবে এবং নিজকে শোনাবে। কেননা নিজের ব্যাপারে
সে নিজের ইমাম। আর চাইলে চুপে চুপে পাঠ করবে। কেননা, তার পিছনে এমন কেউ নেই, যাকে সে শোনাবে। তবে উচ্চৈস্বরে পাঠ করাই উত্তম। যাতে জামা’আতের অনুরূপ আদায় হয়। যুহর ও আসরে ইমাম কিরাত চুপে চুপে পড়বে। এমন কি আরাফাতে হলেও। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)
বলেছেন- দিবসের সালাত নির্বাক। অর্থাত্ তাতে শ্রুত কিরাত নেই। আরাফা সম্পর্কে ইমাম মালিক (র.) এর ভিন্নমত রয়েছে। আর আমাদের বর্ণিত হাদীছটি তার বিপক্ষে দলীল। আর জুমুআ ও দই ঈদে উচ্চৈস্বরে পাঠ করবে। কেননা উচ্চৈস্বরে পাঠের বর্ণনা মশহূর ভাবে চলে
এসেছে। দিবসে নফল সালাত চুপে চুপে পাঠ করবে। আর ফরজ সালাতের উপর কিয়াস করে রাত্রের সালাতে মুনাফারিদের ইখতিয়ার রয়েছে। কেননা, নফল সালাত হলো ফরযের সম্পূরক। সুতরাং (কিরাআতের বেলায়) নফল ফরযের অনুরূপ হবে।
যে ব্যক্তির ঈশার সালাত ফউত হয়ে যায় এবং সূর্যোদয়ের পর তা পড়ে, সে যদি উক্ত সালাতে ইমামতি করে তাহলে উচ্চস্বরে কিরাত পড়বে। এর সকালে জামা’আতের সাথে ফজরের সালাত কাযা করার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যেমন করেছিলেন। আর যদি সে একা সালাত পড়ে, তাহলে অবশ্যই
নীরবে কিরাত পড়বে। (উভয় রকম পড়ার) ইখতিয়ার থাকবে না। এটাই বিশুদ্ধ মত। কেননা উচ্চৈস্বরে কিরাত সম্পৃক্ত রয়েছে জামা’আতের সাথে অবশ্যম্ভাবীরূপে, কিংবা সময়ের সাথে স্বেচ্ছামূলকভাবে মুনাফারিদের ক্ষেত্রে। অথচ এখানে দু’টোর কোনটাই পাওয়া যায় নি। যে
ব্যক্তি ঈশার প্রথম দুই রাকা’আতে সূরা পাঠ করল কিন্তু সূরাতুল ফাতিহা পাঠ করেনি, সে শেষ দুই রাকাআতে তা দোহরাবে না। পক্ষান্তরে যদি সূরাতুল ফাতিহা পড়ে থাকে কিন্তু তার সাথে অন্য সূরা যোগ না করে থাকে, তাহলে শেষ দুই রাকাআতে ফাতিহা ও সূরা দুটোই
পড়বে এবং উচ্চৈস্বরে পড়বে। এটা ইমাম আবূ হানীফা ও মুহাম্মদ (র.)এর মত। তবে ইমাম আবূ ইউসূফ (র.) বলেন, দুটোর মধ্যে কোনটাই কাযা করবে না। কেননা ওয়াজিব যখন নিজ সময় থেকে ফউত হয়ে যায়, তখন পরবর্তীতে বিনা দলীলে সেটাকে কাযা করা যায় না।
উল্লেখিত ইমামদ্বয়ের পক্ষে দলীল – যা উভয় অবস্থার পার্থক্যের সাথে সম্পৃক্ত যে, সূরাতুল ফাতিহাকে শরীআতে এমন অবস্থায় নির্দিষ্ট করা হয়েছে যে, তার পরে সূরা সংযুক্ত হবে। সুতরাং যদি ফাতিহাকে শেষ দুই রাকাআতে কাযা করা হয় তাহলে তরতীবের দিক থেকে সূরার
পর সূরাতুল ফাতিহা এসে যাবে। অর্থাত্ এটা নির্ধারিত অবস্থানের বিপরীত। আর (প্রথম দুই রাকাআতে) সূরা ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি ভিন্ন। কেননা তা শরীআত নির্ধারিতরূপে কাযা করা সম্ভব।
উল্লেখ্য যে, এখানকার পাঠে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে (কাযা করা) ওয়াজিব হওয়া বুঝায়। আর মূল গ্রন্থের উল্লেখিত শব্দে মুস্তাহাব হওয়া বুঝায়। কেননা সূরার কাযা যদিও ফাতিহার পরে হচ্ছে তবু এ সূরা নিজ ফাতিহার সাথে সংযুক্ত হচ্ছে না। সুতরাং নির্ধারিত
অবস্থান সর্বাংশে বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আর উভয়টিতে উচ্চৈস্বরে পাঠ করবে। এটাই বিশুদ্ধ মত। কেননা একই রাকাআতে সরব ও নীরব পাঠ একত্র করা মানায় না। আর নফল তথা ফাতিহার মধ্যে পরিবর্তন আনা উত্তম। অনুচ্চৈস্বরে পাঠ হল যেন নিজে শোনতে পায়। আর উচ্চৈস্বরের
পাঠ হল অপরে শোনতে পায়। এ হল ফকীহ্ আবূ জা’ফর হিন্দওয়ানীর মত। কেননা, আওয়াজ ব্যতীত শুধু জিহবা সণ্চালনকে কিরাত বলা হয় না। ইমাম কারখী (র.) এর মতে উচ্চৈস্বরের সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো নিজেকে শোনানো আর অনুচ্চৈস্বরের পরিমাণ হলো হরফের বিশুদ্ধ উচ্চারণ।
কেননা, কিরাত বা পাঠ মুখের কাজ, কানের কাজ নয়। কুদূরী গ্রন্থের শব্দে এর প্রতি ইংগিত রয়েছে।
তালাক প্রদান, আযাদ করা, ব্যতিক্রম যোগ করা ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণমূলক যাবতীয় মাসআলার মধ্যে মতপার্থক্যের ভিত্তি হল উক্ত নীতির পার্থক্যের উপর। সালাতে যে পরিমাণ কিরাত যথেষ্ট হয়, তার সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো ইমাম আবূ হানীফা (র.) এর মতে এক আয়াত আর ইমাম
আবূ ইউসূফ ও মুহাম্মদ (র.) এর মতে ছোট তিন আয়াত অথবা দীর্ঘ এক আয়াত। কেননা, এর চেয়ে কম পরিমাণ হলে তাকে কারী বলা হয় না। সুতরাং তা এক আয়াতের কম পাঠ করার সমতূল্য। ইমাম আবূ হানীফা (র.) এর দলীল হলো, আল্লাহ তা’আলার বাণী- কুরআনের যতটুকু পরিমাণ সহজ
হয়, তা তোমরা পড়ো। এখানে (এক আয়াতে বা তার অধিকের মাঝে) কোন পার্থক্য করা হয়নি। তবে এক আয়াতের কম পরিমাণ (সর্বসম্মতিক্রমেই কুরআন গণ্য হওয়ার হুকুমের) বহির্ভূত। আর পূর্ণ আয়াত আয়াতের অংশবিশেষের সমার্থক নয়। আর সফরের সূরা ফাতিহার সাথে অন্য যে কোন
সূরা ইচ্ছা হয় পড়বে। কেননা বর্ণিত আছে যে, নবী (সা.) তার সফরে ফজরের সালাতে ফালাক ও নাস সূরাদ্বয় পাঠ করেছিলেন। তাছাড়া সালাতের অর্ধেক রহিত করার ক্ষেত্রে সফরের প্রভাব রয়েছে। সুতরাং কিরাত হ্রাস করণের ব্যাপারে তার প্রভাব থাকা স্বাভাবিক।এ হুকুম
তখন, যখন সফরে তাড়াহুড়া থাকে। পক্ষান্তরে যদি (মুসাফির) স্থিতি ও শান্তির পরিবেশ থাকে, তাহলে ফজরের সালাতে সূরা বুরূজ ও ইনশাক্কা পরিমাণ সূরা পাঠ করবে। কেননা, এভাবে তাখফীক সহকারে সুন্নাতের উপরও আমল সম্ভব হয়ে যাবে।
মুকীম অবস্থায় ফজরের উভয় রাকাআতে সূরাতূল ফাতিহা ছাড়া চল্লিশ বা পণ্চাশ আয়াত পড়বে। চল্লিশ থেকে ষাট এবং ষাট থেকে একশ’ আয়াত পাঠ করার কথাও বর্ণিত রয়েছে। আর এ সব সংখ্যার সমর্থনে হাদীছ এসেছে। বর্ণনাগুলোর মাঝে সামঞ্জস্য বিধান এভাবে হতে পারে যে, (কিরাত
শ্রবণে) আগ্রহীদের ক্ষেত্র্রে একশ’ আয়াত এবং অলসদের ক্ষেত্রে চল্লিশ আয়াত এবং মধ্যমদের ক্ষেত্রে পণ্চাশ থেকে ষাট আয়াত পাঠ করবে। কারো কারো মতে রাত্র ছোট বড় হওয়া এবং কর্মব্যস্ততা কম-বেশী হওয়ার অবস্থা বিবেচনা করা হবে। ইমাম কুদূরী বলেন, যুহরের
নামাযেও অনুরূপ পরিমাণ পাঠ করবে। কেননা সময়ের প্রশস্ততার দিক দিয়ে উভয় সালাত সমান। মবসূত গ্রন্থে বলা হয়েছে- ‘কিংবা তার চেয়ে কম’। কেননা তা কর্মব্যস্ততার সময়। সুতরাং অনীহা এড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে ফজর থেকে কমানো হবে। আসর ও ‘ঈশা একই রকম। দু’টোতেই
আওসাতে মুফাসসাল পাঠ করবে। আর মাগরিবে তার চেয়ে কম অর্থাত্ তাতে ‘কিসারে মুফাসসাল’ পাঠ করবে। এ বিষয়ে মূল দলীল হলো আবূ মূসা আশ’আরী (রা.) এর নামে প্রেরিত উমর ইবন খাত্তাব (রা.) এর এই মর্মে লিখিত পত্র যে, ফজরে ও যুহরে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ পড়ো।
তাছাড়া মাগরিবের ভিত্তিই হলো দ্রুততার উপর। সুতরাং হালকা কিরাতই তার জন্য অধিকতর উপযোগী। আর আসর ও ‘ঈশায় মুস্তাহাব হলো বিলম্বে পড়া। আর কিরাত দীর্ঘ করলে সালাত দু’টি মুস্তাহাব ওয়াক্ত অতিক্রম করার আশংকা রয়েছে। সুতরাং এ দুই সালাতে আওসাতে মুফাসসাল
নির্ধারণ করা হয়। ফজরে প্রথম রাকাআতকে দ্বিতীয় রাকাআতের তুলনায় দীর্ঘ করবে, যাতে লোকদের জামা’আত ধরার ব্যাপারে সহায়ক হয়। ইমাম কুদূরী বলেন, যুহরের উভয় রাকাআত সমান। তা ইমাম আবূ হানীফা ও আবূ ইউসূফ (র.) এর মত। আর ইমাম মুহাম্মদ (র.) বলেন, সব সালাতেই
প্রথম রাকাআতকে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ করা আমার কাছে পসন্দনীয়। কেননা, বর্ণিত আছে যে, নবী (সা.) সব সালাতেই প্রথম রাকাআতকে অন্য রাকাআতের তুলনায় দীর্ঘ করতেন। প্রথমোক্ত ইমামদ্বয়ের দলীল এই যে, উভয় রাকাআতই কিরাতের সমান হকদার। সুতরাং পরিমাণের ক্ষেত্রেও
উভয় রাকাআত সমান হতে হবে। তবে ফজরের সালাত এর বিপরীত। কেননা, তা ঘুম ও গাফলাতের সময়। আর উদ্ধৃত হাদীছটি সানা, আউযুবিল্লাহ্ ও বিসমিল্লাহ্ পড়ার প্রেক্ষিতে দীর্ঘ হওয়ার সাথে সম্পৃক্ত। আর কম, বেশীর ক্ষেত্রে তিন আয়াতের কম ধর্তব্য নয়। কেননা অনায়াসে
এতটুকু কম-বেশী থেকে বেঁচে থাকা সম্ভবপর নয়। আর কোন সালাতের সহিত এমন কোন সূরা নির্দিষ্ট নেই যে, এটি ছাড়া সালাত জাইয হবে না। কেননা, আমরা পূর্বে যে আয়াত পেশ করেছি, তা নিঃশর্ত। বরং কোন সালাতের জন্য কুরআনের কোন অংশকে নির্ধারণ করে নেওয়া মাকরূহ।
কেননা, তাতে অবশিষ্ট কুরআনকে বর্জন করা হয় এবং বিশেষ সূরার ফযীলতের ধারণা জন্মে। মুক্তাদী ইমামের পিছনে কিরাত পাঠ করবে না। সূরাতুল ফাতিহার ব্যাপারে ইমাম শাফিই (র.) এর ভিন্নমত রয়েছে। তার দলীল এই যে, কিরাত হলো সালাতের অন্যন্য রুকনের মত একটি
রুকন। সুতরাং তা পালনে ইমাম ও মুক্তাদী উভয়ে শরীক থাকবেন।
আমাদের দলীল হলো রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এর বাণী- যে ব্যক্তির ইমাম রয়েছে, সেক্ষেত্রে ইমামের কিরাত তার কিরাত রূপে গণ্য। এবং এর উপরই সাহাবীদের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর কিরাত হলো উভয়ের মাঝে শরীকানামূলক রুকন। তবে মুক্তাদীর অংশ হলো নীরব থাকা ও মনোযোগসহ
শ্রবণ। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন- (ইমাম) যখন কুরআন পাঠ করেন তখন তোমরা খামুশ থাকো। তবে ইমাম মুহাম্মদ (র.) থেকে বর্ণিত আছে যে, সতর্কতা অবলম্বন হিসাবে পাঠ করাই উত্তম। কিন্তু ইমাম আবূ হানীফা ও আবূ ইউসূফ (র.) এর মতে তা মাকরূহ। কেননা এ সম্পর্কে
হুশিয়ারি রয়েছে। আর মনোযোগ সহকারে শুনবে এবং নীরবে থাকবে। যদিও ইমাম আশা ও ভয়ের আয়াত পাঠ করেন। কেননা, নীরবে শ্রবণ ও নীরবতা আয়াত দ্বারা ফরজ সাব্যস্ত হয়েছে। আর নিজে পাঠ করা, কিংবা জান্নাত প্রার্থনা করা এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ চাওয়া এ সকল এতে
বাধা সৃষ্টি করে। খুতবার হুকুমও অনুরূপ। তেমনি হুকুম নবী (সা.) এর উপর দুরূদ পাঠ করার সময়ও। কেননা, মনোযোগ সহকারে খুতবা শ্রবণ করা ফরজ। তবে যদি খতীব এ আয়াত পড়েন- তখন শ্রোতা মনে মনে দুরূদ পড়বে। অবশ্য মিম্বর থেকে দূরের লোকদের সম্পর্কে আলিমগণের
মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে নীরব থাকার মধ্যে ইহতিয়াত রয়েছে, যাতে (কমপক্ষে) খামুশ থাকার ফরজ পালিত হয়। সঠিক বিষয় আল্লাহই উত্তম জানেন।



Post a Comment

0 Comments