আল-কুরআনের আলোকে জাহান্নামের বিবরণ

আল-কুরআনের আলোকে জাহান্নামের বিবরণ



জাহান্নামের অস্তিত্ব :

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর আনুগত্যশীল বান্দাদের জন্য জান্নাত ও অমান্যকারীদের জন্য জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন যা বর্তমানে বিদ্যমান এবং কখনই তা ধ্বংস হবে না। তিনি মানুষ ও জ্বিন জাতি সৃষ্টি করার পূর্বেই জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তার অধিবাসী সৃষ্টি করেছেন। এ ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত ঐক্যমত পোষণ করেছেন। তবে মু‘তাযিলা ও ক্বাদারিয়াগণ এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে বলেন- আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন জান্নাত ও জাহান্নামকে সৃষ্টি করবেন।

জাহান্নামের প্রহরী 
মহান আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন নির্মমহৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণকে জাহান্নামের প্রহরী নিযুক্ত করেছেন যারা আল্লাহর আদেশ পালনে সদা প্রস্তুত থাকে, কখনোই তা অমান্য করে না। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলার বাণী, ‘হে মু’মিনগণ তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মমহৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না আল্লাহ তাঁদেরকে যা আদেশ করেন তা পালনে। আর তাঁরা যা করতে আদিষ্ট হয় তাই পালন করে’ সূরা আত-তাহরীম: ৬

জাহান্নামের  গভীরতা
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর অবাধ্য বান্দাদের শাস্তি দেয়ার জন্য জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন যার প্রশস্ততা বিশাল এবং গভীরতা অনেক যার প্রমাণ নিম্নরূপ:
পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে প্রবেশ করবে। জাহান্নামীদের সংখ্যার আধিক্য বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন মানুষ জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এর পরেও আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামীদেরকে বিশাল আকৃতির দেহ দান করবেন। যেমন- তাদের এক একটি দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের সমান, এক কাঁধ থেকে অপর কাঁধের দুরুত্ব একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহীর তিন দিনের পথ, চামড়া হবে তিন দিনের পথ পরিমান মোটা, যা জাহান্নামীদের দেহ অবয়ব অধ্যায়ে আলোচনা করব ইন্‌শাআল্লাহ। এতো বিশালাকৃতির হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন মানুষ জাহান্নামে প্রবেশ করলেও তা পূর্ণ হবে না। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের পাঁ জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামকে বলবেন: ‘সেদিন আমি জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করব, তুমি কি পূর্ণ হয়ে গেছ? জাহান্নাম বলবে, আরও কিছু আছে কি?’সূরা ক্বাফ: ৩০
এই উত্তর শুনে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজ পাঁ জাহান্নামের মধ্যে প্রবেশ করাবেন। এ সম্পর্কে হাদীছে এসেছে, আনাস ইবনে মালেক (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, জাহান্নামে অনবরত (জ্বিন-মানুষ) কে নিক্ষেপ করা হবে। তখন জাহান্নাম বলতে থাকবে, আরো অধিক কিছু আছে কি? এভাবে ততক্ষণ পর্যন্ত বলতে থাকবে, যতক্ষণ না আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজ পাঁ প্রবেশ করাবেন। তখন জাহান্নামের একাংশ অপর অংশের সাথে মিলে যাবে এবং বলবে, তোমার মর্যাদা ও অনুগ্রহের কসম! যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।
জাহান্নামের গভীরতা সম্পর্কে হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর সাথে ছিলাম। যখন তিনি একটি শব্দ শুনলেন তখন বললেন, তোমরা কি জান এটা কি? তখন আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। রাসূলুল্লাহ (ছা.) বললেন, এটি এক খন্ড পাথর যা জাহান্নামের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে ৭০ বছর পূর্বে, এখন পর্যন্ত সে নিচের দিকে অবতরণ করছে জাহান্নামের তলা খুজে পাওয়া অবধি। অন্য হাদীছে এসেছে, আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) একদা একটি বড় পাথর খন্ডের দিকে ইশারা করে বলেন যে, যদি এই পাথরটি জাহান্নামের কিনারা দিয়ে তার ভিতরে নিক্ষেপ করা যায়, তবে ৭০ বছরেও সে তলা পাবেনা।
জাহান্নাম এতো বিশাল যে, ক্বিয়ামতের দিন তাকে টেনে আনতে বিপুল পরিমাণ ফেরেশতার প্রয়োজন হবে। হাদীছে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ক্বিয়ামতের দিন জাহান্নামকে এমন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে, যার ৭০ টি লাগাম হবে এবং প্রতিটি লাগামের সাথে ৭০ হাজার ফেরেশতা থাকবে, তাঁরা তা টেনে আনবে।
ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর দু’টি বিশাল সৃষ্টি চন্দ্র-সূর্যকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, যার প্রমাণে বায়হাক্বীতে বর্ণিত হয়েছে: হাসান বাছরী (রহ.) বলেন, আবু হুরায়রাহ (রা.) আমাদেরকে রাসূল (ছা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ক্বিয়ামতের দিন সূর্য ও চন্দ্রকে দুটি পনিরের আকৃতি বানিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তখন হাসান বাছরী জিজ্ঞেস করলেন, তাদের অপরাধ কি? জবাবে আবু হুরায়রাহ বললেন, আমি রাসূল (ছা.) হতে এ ব্যাপারে যা কিছু শুনেছি, তাই বর্ণনা করলাম, এই কথা শুনে হাসান বাছরী নীরব হয়ে গেলেন।
উপরোল্লিখিত দলীল সমূহ থেকে প্রতীয়মাণ হয় যে, জাহান্নামের বিশালত্ব অকল্পনীয়। কারণ এত বিশালাকৃতির হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন জাহান্নামী এবং পৃথিবী থেকে ১৩ লক্ষ গুণ বড় সূর্যকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার পরেও যদি তার পেট পূর্ণ করার জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিজের পাঁ প্রবেশ করানোর প্রয়োজন হয়, তাহলে তা কত বিশাল হতে পারে তা আমাদের কল্পনার বাইরে। আল্লাহ আমাদের তা হতে রক্ষা করুন। আমীন!
জাহান্নামের দরজা সমূহ 
জাহান্নামের দরজা মোট সাতটি যা আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেছেন, ‘অবশ্যই জাহান্নাম তাদের সকলেরই প্রতিশ্রুত স্থান, উহার সাতটি দরজা আছে, প্রত্যেক দরজার জন্য পৃথক পৃথক শ্রেণী আছে’ সূরা হিজির: ৪৩-৪৪
অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনে কাছীর (রহ.) তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেন, জাহান্নামের প্রত্যেক দরজায় শয়তান ইবলীসের অনুসারীদের কিছু অংশের প্রবেশের কথা লিখা আছে, তারা সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, পালানোর কোন পথ থাকবে না।
প্রত্যেক জাহান্নামী তাদের আমল অনুযায়ী জাহান্নামের দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে এবং তার নিম্নতম স্তরে অবস্থান করবে। আলী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘জাহান্নামের সাতটি দরজা আছে যা পর্যায়ক্রমে একটি অপরটির উপর অবস্থিত, সর্বপ্রথম প্রথমটি, অতঃপর দ্বিতীয়টি, অতঃপর তৃতীয়টি পূর্ণ হবে, অনরূপভাবে সবগুলো দরজাই পূর্ণ হবে’।
এখানে দরজা বলতে স্তরকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, জাহান্নামের সাতটি স্তর রয়েছে যা একটি অপরটির উপর অবস্থিত এবং তা পর্যায়ক্রমে পূর্ণ হবে।
যখন কাফিরদেরকে জাহান্নামের নিকটে নিয়ে আসা হবে তখন তার দরজা সমূহ খুলে দেয়া হবে, অতঃপর তারা চিরস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য সেখানে প্রবেশ করবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘কাফিরদেরকে জাহান্নামের দিকে দলে দলে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, যখন তারা জাহান্নামের নিকটে উপস্থিত হবে তখন ইহার প্রবেশদ্বারগুলি খুলে দেয়া হবে এবং জাহান্নামের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের নিকটে কি তোমাদের মধ্য হতে রাসূল আসেনি যারা তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের আয়াত তেলাওয়াত করত এবং এই দিনের সাক্ষাত সম্বন্ধে তোমাদেরকে সতর্ক করত? তখন তারা বলবে অবশ্যই এসেছিল। বস্তুত কাফিরদের প্রতি শাস্তির কথা আজ বাস্তবায়িত হয়েছে’ সূরা যুমার: ৭১
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদেরকে লক্ষ করে বলবেন, ‘জাহান্নামের দ্বারসমূহে প্রবেশ কর স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য। কত নিকৃষ্ট অহংকারীদের আবাসস্থল।’ সূরা যুমার: ৭২
জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপের পর তার দরজাসমূহ এমনভাবে বন্ধ করে দেয়া হবে যা হতে বের হওয়ার কোন অবকাশ থাকবে না।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘আর যারা আমার নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করেছে, তারাই হতভাগ্য। তারা পরিবেষ্টিত হবে অবরুদ্ধ অগ্নিতে’ সূরা বালাদ: ১৯-২০
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে, যে অর্থ জমায় ও তা বার বার গননা করে, সে ধারণা করে যে, তার অর্থ তাকে অমর করে রাখবে, কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায়, তুমি কি জান হুতামা কি? ইহা আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত হুতাশন, যা হৃদয়কে গ্রাস করবে, নিশ্চয়ই ইহা তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখবে দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে’ সূরা হুমাযাহ্: ১-৯
জাহান্নামীদের দেহের আকৃতি
আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামীদেরকে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি দেয়ার লক্ষে তাদেরকে বিশালাকৃতির দেহ দান করবেন। যেমন- তাদের এক কাঁধ থেকে অপর কাঁধের দূরত্ব হবে দ্রুতগামী ঘোড়ার তিন দিনের পথ, এক একটি দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের সমান, চামড়া হবে তিন দিনের পথ সমতুল্য পোর বা মোটা। এ সম্পর্কে হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রাহ (রা.) সূত্রে নবী (ছা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কাফিরের দু’কাধের মাঝের দূরত্ব একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহীর তিন দিনের ভ্রমণপথের সমান হবে।
অন্য হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, কাফিরের এক একটি দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের সমান এবং শরীরের চামড়া হবে তিন দিনের সফরের দূরত্ব পরিমাণ মোটা।
অন্য হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ক্বিয়ামতের দিন কাফিরের দাঁত হবে উহুদ পাহাড়সম বড়, রান বা উরু হবে বাইযা পাহাড়সম বিশাল এবং তার নিতম্বদেশ হবে রাবাযার মত তিন দিনের চলার পথের দূরত্ব পরিমাণ বিস্তৃত।
অন্য হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রাহ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, জাহান্নামীদের মধ্যে কাফিরের শরীরের চামড়া হবে বিয়াল্লিশ হাত মোটা, দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের সমান এবং জাহান্নামে তার বসার স্থান হবে মক্কা-মদীনার মধ্যবর্তী ব্যবধান পরিমাণ।
জাহান্নামীদের খাদ্য-পানীয় এবং পোষাক-পরিচ্ছদ
জাহান্নামীদের খাদ্য হবে যাক্কুম এবং কাঁটাযুক্ত এক প্রকার গাছ। আর পানীয় হবে রক্ত-পুঁজ মিশ্রিত গরম দূর্গন্ধময় পানি। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন, ‘তাদের জন্য খাদ্য থাকবে না কাঁটাযুক্ত ফল ব্যতীত, যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তি করবে না’ সূরা গাশিয়া: ৬-৭
আয়াতে বর্ণিত (দ্বারী’ইল্) হচ্ছে এক প্রকার কাঁটাযুক্ত গাছ, যা হিজায-এ পাওয়া যায়।
উল্লেখিত খাদ্য যা জাহান্নামীগণ ভক্ষণ করবে। কিন্তু এতে তারা কোন স্বাদ অনুভব করবে না এবং শারীরিক কোন উপকারে আসবে না। অতএব, এই খাদ্য তাদেরকে শাস্তি স্বরূপ প্রদান করা হবে।
জাহান্নামীদের খাদ্য হিসাবে নির্ধারিত যাক্কুম সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যাক্কূম বৃক্ষ হবে পাপীদের খাদ্য, গলিত তামার মত তাদের উদরে ফুটতে থাকবে ফুটন্ত পানির মত’ সূরা দুখান: ৪৩-৪৬
আর যাক্কুম-এর আকৃতি উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আপ্যায়নের জন্য কি ইহাই শ্রেয় না যাক্কুম বৃক্ষ? যালিমদের জন্য আমি ইহা সৃষ্টি করেছি পরীক্ষাস্বরূপ, এই বৃক্ষ উদগত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে, ইহার মোচা যেন শয়তানের মাথা, তারা ইহা হতে ভক্ষণ করবে এবং উদর পূর্ণ করবে ইহা দ্বারা। তদুপরি তাদের জন্য থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ। আর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্জ্বলিত অগ্নির দিকে’ সূরা ছাফফাত: ৬২-৬৮
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘অতঃপর হে বিভ্রান্ত অস্বীকারকারীরা! তোমরা অবশ্যই আহার করবে যাক্কুম বৃক্ষ হতে এবং উহা দ্বারা তোমরা উদর পূর্ণ করবে, পরে তোমরা পান করবে উহার উপর গরম পানি, আর পান করবে পিপাষিত উটের ন্যায়। ক্বিয়ামতের দিন ইহাই হবে তাদের আপ্যায়ন সূরা ওয়াকিয়াহ: ৫১-৫৬
উল্লেখিত আয়াত সমূহ থেকে বুঝা যায় যে, যাক্কুম বৃক্ষ যা আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামীদের খাদ্য হিসাবে নির্ধারণ করেছেন তা অতীব নিকৃষ্ট, যা উদগত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে। আর উহার ফল দেখতে কুৎসিত যা আল্লাহ তা‘আলা শয়তানের মাথা স্বদৃশ বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামীদেরকে প্রচন্ড ক্ষুধা প্রদান করবেন, আর এই ক্ষুধার্থ জাহান্নামীদের খাদ্য হিসাবে কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ যাক্কুম প্রদান করবেন। প্রচন্ড ক্ষুধার যন্ত্রণায় যখন তারা এই যাক্কুম বৃক্ষ খাওয়ার চেষ্টা করবে তখন তাদের গলায় এমনভাবে আটকিয়ে যাবে যা নিচেও নামবে না বের হয়েও আসবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আমার নিকট আছে শৃংখল ও প্রজ্জ্বলিত অগ্নি, আর আছে এমন খাদ্য, যা গলায় আটকিয়ে যায় এবং মর্মন্তুদ শাস্তি’ সূরা মুযযাম্মিল: ১২-১৩
এমতাবস্থায় জাহান্নামীরা আল্লাহর নিকটে পানি পানের আবেদন করবে। পান করার জন্য আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে এমন গরম পানি দান করবেন, যা জাহান্নামীরা পিপাসিত উটের ন্যায় পান করবে। অতঃপর তাদের নাড়িভুঁড়ি এমনভাবে ফুটতে থাকবে যেমনভাবে গরম তেল ফুটতে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘এবং যাদেরকে (জাহান্নামী) পান করতে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি যা তাদের নাড়িভূঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিবে’ সূরা মুহাম্মাদ: ১৫
অর্থাৎ যখন তারা তাদের জন্য নির্ধারিত ফুটন্ত পানি পান করবে তখন তাদের পেটের ভেতরের সবকিছুই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে বের হয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন। আমীন!
আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামীদের পানীয় হিসাবে নির্ধারণ করেছেন জাহান্নামীদের শরীর হতে গড়িয়ে পড়া রক্ত পুঁজ মিশ্রিত গরম তরল পদার্থ। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘অতএব এই দিন সেথায় তার কোন সহৃদ থাকবে না এবং কোন খাদ্য থাকবে না ক্ষত নিঃসৃত স্রাব ব্যতীত, যা অপরাধী ব্যতীত কেহ খাবে না’ সূরা হাক্কাহ: ৩৫-৩৭
তিনি আরো বলেন, ‘ইহা সীমালংঘনকারীদের জন্য। সুতরাং তারা আস্বাদন করুক ফুটন্ত পানি ও পুঁজ। আরও আছে এইরূপ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি’ সূরা ছাদ: ৫৭-৫৮
আয়াতে বর্ণিত ফুটন্ত পানি ও পুঁজ অর্থ হলো, জাহান্নামীদের শরীর হতে গড়িয়ে পড়া রক্ত পুঁজ মিশ্রিত গরম তরল পদার্থ। অথবা বলা হয়ে থাকে যেনাকারী মহিলাদের লজ্জাস্থান হতে দুর্গন্ধযুক্ত যা বের হয় তা।
জাহান্নামীদের পানীয় হিসাবে আল্লাহ তা‘আলা আরো নির্ধারণ করেছেন গরম পানি। তিনি ইরশাদ করেন: ‘এবং যাদেরকে (জাহান্নামী) পান করতে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি যা তাদের নাড়িভূঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিবে’ সূরা মুহাম্মাদ: ১৫
তিনি অন্যত্র বলেন, ‘তারা পানীয় চাইলে তাদেরকে দেয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানীয়, যা তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে, ইহা নিকৃষ্ট পানীয় ও অগ্নি কত নিকৃষ্ট আশ্রয়’ সূরা কাহফ: ২৯
তিনি অন্যত্র বলেন, ‘তাদের প্রত্যেকের জন্য পরিণামে জাহান্নাম রয়েছে এবং প্রত্যেককে পান করানো হবে গলিত পুঁজ, যা সে অতি কষ্টে গলাধঃকরণ করবে এবং উহা গলাধঃকরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। সর্বদিক হতে তার নিকট আসবে মৃত্যু যন্ত্রণা কিন্তু তার মৃত্যু ঘটবে না এবং সে কঠোর শাস্তি ভোগ করতেই থাকবে’ সূরা ইবরাহীম: ১৬-১৭
অতএব, উল্লেখিত আয়াত সমূহ থেকে প্রতীয়মাণ হয় যে, জাহান্নামীদের পানীয় হিসাবে আল্লাহ তা‘আলা চার প্রকারের বস্তু নির্ধারণ করেছেন। যেমন:
১- গরম পানি যার উত্তপ্ততা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার পরে অধিক গরম করা সম্ভব নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তারা জাহান্নামের অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে। সূরা আর-রাহমান: ৪৪ 
তিনি আরো বলেন, তাদের পান করানো হবে ফুটন্ত ঝর্ণা থেকে। সূরা গাশিয়াহ: ৫
আয়াতে তাপের শেষ পর্যায়কে বুঝানো হয়েছে যার পরে অধিক গরম করা সম্ভব নয়।
২- জাহান্নামীদের শরীর হতে গড়িয়ে পড়া রক্ত পুঁজ মিশ্রিত গরম তরল পদার্থ। অথবা বলা হয়ে থাকে যেনাকারী মহিলাদের লজ্জাস্থান হতে দুর্গন্ধযুক্ত যা বের হয় তা।
৩- জাহান্নামীদের গোশত এবং চামড়া নিঃসৃত পুঁজ।
৪- গলিত তামা।
আর পোষাক হিসাবে আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামীদের জন্য আগুনের তৈরী পোষাক নির্ধারণ করেছেন। যেমন- তিনি বলেছেন, ‘যারা কুফরী করে তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোষাক, আর তাদের মাথার উপর ঢালা হবে ফুটন্ত পানি’ সূরা হাজ্জ: ১৯
তিনি আরো বলেন, ‘সেই দিন তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে শৃংখলিত অবস্থায়, আর তাদের জামা হবে আলকাতরার এবং অগ্নি আচ্ছন্ন করবে তাদের মুখমণ্ডল’ সূরা ইবরাহীম: ৪৯-৫০
এ সম্পর্কে হাদীছে এসেছে, আবু মালেক আল-আশ‘আরী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, (মৃতের জন্য) বিলাপ করে ক্রন্দনকারিণী তার মৃত্যুর পূর্বে তাওবাহ না করলে ক্বিয়ামতের দিন তাকে আলকাতরার তৈরী পোষাক এবং দস্তার তৈরী বর্ম পরিয়ে উঠানো হবে।




Post a Comment

0 Comments