জান্নাত ও তার নেয়ামত ১ থেকে ১০ পর্যন্ত

জান্নাত ও তার নেয়ামত



প্রশ্নঃ জান্নাত অর্থ কী? 

জান্নাতের আকৃতি কিরূপ? জান্নাতের অধিবাসীদের অবস্থা কী হবে? জান্নাতে কি কি নেয়ামত দান করা হবে? জান্নাতীদের প্রথম খাদ্য কি হবে? জান্নাত কয়টি ও কি কি?

উত্তরঃ ইসলাম এসেছে পরকালে জান্নাতের সুসংবাদ দিতে। তাই কোরআন মজিদ ও হাদীস শরীফের অধিকাংশ বর্ণনাতেই জান্নাতের কথা আলোচিত হয়েছে। বিশেষ করে সুরা আর-রহমান, সূরা ওয়াকিয়াহ, সূরা দাহার এবং সূরা গাশিয়ায় সবচেয়ে বেশী আলোচিত হয়েছে জান্নাত ও তার অভ্যন্তরের নেয়ামত সম্পর্কে। নবী করীম (ﷺ) ঐ সমস্ত আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়েছেন আরো বেশী বিস্তারিতভাবে। কেননা, শবে মি’রাজে তিনি জান্নাত ও জাহান্নাম স্বচক্ষে দর্শন করে এসেছেন। এজন্যই তিনি “শাহেদ” বা হাযির নাযির খেতাবে ভূষিত। তাই কোরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে জান্নাতের গঠন ও কাঠামো, জান্নাতের রূপসৌন্দর্য, জান্নাতের দৈর্ঘ-প্রস্থ, জান্নাতীদের রূপসৌন্দর্য, হুরও গিল্মান, জান্নাতের আরাম আয়েশের বিবরণ ক্রমানুসারে দেয়া হলো।

(১) জান্নাতের গঠনাকৃতির বিবরণ

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস,
عن ابی ھریرۃ رضی اللّٰہ عنہ قال قلت یا رسول اللّٰہ مم خلق الخلق؟ قال من الماء قلنا الجنۃ ما بنا ؤھا ؟ قال لبنۃ من ذھب من فضۃ ولاطھا المسک الازفر وحصباءھا اللؤلؤ والیاقوت۔ وتربتھا الزعفران ۔ من یدخلھا ینعم ولا یبأس یخلد ولا یموت ولا یبلی ثیابھم ولا یغنی مشبابھم (رواہ الترمذی والدارمی)

অর্থঃ হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন- আমি রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে আরয করলাম- ইয়া রাসুলাল্লাহ্! সৃষ্টজগত কিসের থেকে সৃষ্টি হয়েছে? (অর্থাৎ সৃষ্ট জগতের উপাদান কি?) তিনি এরশাদ করলেন “পানির উপাদান থেকে”। আমরা পুনরায় প্রশ্ন করলাম- জান্নাত কিসের তৈরী? হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করলেন- “জান্নাতের উপাদান হচ্ছে- একটি ইট স্বর্নের- অন্যটি রৌপ্যের এবং গাথুনীর মসলা হবে সুগন্ধ মিশ্ক। আর তার কাঠ বা খুটী হবে লুলু ও ইয়াকুত পাথরের এবং তার মাটি বা ভিটা হবে সুগন্ধ জাফ্রান। যেব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে বিভিন্ন ধরণের নেয়ামত ভোগ করবে এবং বিভিন্নভাবে পুরস্কৃত হবে- কোন প্রকারেই নিরাশ হবে না। সে মৃত্যুহীন চিরস্থায়ী হবে। তাঁর পোষাক পুরাতন হবেনা এবং যৌবনও ক্ষয়প্রাপ্ত হবে না- বরং অটুট থাকবে”। (মুসনাদে আহমদ, তিরমিযি ও দারামী)।

ব্যাখ্যাঃ এখানে বলা হয়েছে “পানি হতে সব কিছু সৃষ্ট। কিন্তু হযরত জাবেরের হাদীসে বলা হয়েছে- “নূরে মোহাম্মদী হতে সবকিছু সৃষ্ট”। কারণ কি?

এর সমন্বয় এভাবে হবেঃ নূরে মোহাম্মদী হতেই পানিসহ সবকিছু সৃষ্ট। এটা শতসিদ্ধ কথা। তাই তার উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। তারপরে পানি হতে আসমান জমীন ও মানুষের উপাদান সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ- পানি সহ প্রত্যেক বস্তুতেই নূরে মোহাম্মদী হচ্ছে মূল উপাদান এবং পানি হচ্ছে আনুসঙ্গিক উপাদান। সৃষ্টিরহস্য ও সৃষ্টিতত্বের মৌলিক নীতি বিবৃত হয়েছে অত্র হাদীসে, বিস্তারিত বিষয় ও বিশ্লেষন বর্ণিত হয়নি। তদুপরি- “খাল্ক বা সৃষ্টজীব শব্দের মধ্যে নবীজী অন্তর্ভূক্ত নন”। তিনি ছাড়া সব বস্তুর মধ্যে পানি হলো অন্যতম উপাদান। আব, আতশ, খাক, বাদ- এই চার উপাদানে অন্যান্য জড় জিনিস সৃষ্টি। সুতরাং “প্রথম সৃষ্টি” শব্দটি আপেক্ষিক। প্রথমের উপরেও আরেক প্রথম থাকতে পারে। অতএব অত্র হাদীসে নূরে মোহাম্মদীকে অস্বীকার করা হয়নি।

(২) জান্নাতের গেইট বা সিংহ দরজা কয়টি ও কি কি?

জান্নাতে বিভিন্ন ধরণের ও সাইজের গেইট বা সদর দরজা হবে। কাযী আয়ায (রহঃ) ও অন্যান্য হাদীস বিশারদগনের মতে জান্নাতের মেইন গেইট বা সদর দরজার সংখ্যা হলো ষোল। যথা- বাবু মুহাম্মদ, বাবুস সালাত, বাবুস সউম, বাবুয যাকাত, বাবুস সাদ্ক্বা, বাবুল হজ্ব, বাবুল ওমরাহ্, বাবুল জিহাদ, বাবুস সিলাহ্ (আত্মীয়তার বন্ধন), বাবুল কাযিমীনাল গায়য (গোস্বা হজমকারীর গেইট), বাবুর রাযীন (তৃপ্তি ও সন্তুষ্টি), বাবুল আয়মান (বিনা হিসাবে জান্নাতীদের দরজা), বাবুত তাওবাহ্, বাবুর রহমত, বাবুল ফারাহ্, বাবুর রাইয়ান- ইত্যাদি। ইমাম কুরতুবী বলেন- বেহেস্তের মেইন গেইটের সংখ্যা প্রসিদ্ধ হলো ৮টি। বাকীগুলো সংশ্লিষ্ট এবং তুলনামূলক ছোট। এদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ্পাক এরশাদ করেছেন,
وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَرًا حَتَّى إِذَا جَاؤُوهَا وَفُتِحَتْ أَبْوَابُهَا
অর্থঃ “যারা দুনিয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতো, তাঁদেরকে স্বসম্মানে ফিরিস্তারা দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবে। যখন তাঁরা জান্নাতের নিকটবর্তী হবে এবং তাঁদের জন্য জান্নাতের গেইট ও দরজাসমূহ খোলা হবে”। (সূরা যুমার ৭৩ আয়াতের প্রথমাংশ)।

অত্র আয়াতে  أَبْوَابُ শব্দ দ্বারা জান্নাতের বিভিন্ন মেইন গেইটের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম হযরত আবু হোরায়রা থেকে একখানা হাদীস বর্ণনা করেছেন। এই হাদীসে জান্নাতের গেইট সম্পর্কে নবীজী কয়েকটি গেইটের কথা উল্লেখ করেছেন। যথা,
عن ابی ھریرۃ رضی اللّٰہ عنہ ان رسول اللّٰہ ﷺ قال من انفق زوجین فی سبیل اللّٰہ نودی فی الجنۃ یا عبدا للّٰہ ھذا خیر فمن کان من اھل الصلوۃ دعی من باب الصلوۃ ومن کان من اھل الجھاد دعی من باب الجھاد۔ ومن کان من اھل الصدقۃ ۔ دعی من باب الصدقۃ ومن کان من کان من اھل الصیام دعی من باب الریان۔ (بخاری ومسلم)

অর্থঃ হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন- “যেব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় একই বস্তুর জোড়ায় জোড়ায় (স্বর্ন ও রৌপ অথবা দীনার ও দিরহাম) দান করবে- তাঁকে আল্লাহ্পাক জান্নাতে ডাক দিয়ে বলবেন, “হে আল্লাহর বান্দা। ইহা তোমার জন্য অতি উত্তম”। নবী করীম (ﷺ) অতঃপর বল্লেন- “যেব্যক্তি নামাযী হবে- তাঁকে বাবুস সালাত গেইট দিয়ে ডেকে ভিতরে নিবেন। মোজাহিদকে ডেকে নিবেন বাবুল জিহাদ দিয়ে। যাকাত ও সাদক্বাকারীকে ডেকে নিবেন বাবুস সাদাক্বা দিয়ে। রোযাদারকে ডেকে নিবেন বাবুর রাইয়ান দিয়ে”। (বুখারী ও মুসলিম)।

ব্যাখ্যাঃ জান্নাতের বিভিন্ন গেইট হবে সাইনবোর্ডযুক্ত। যে যা আমল করেছে, তাঁকে সে নামের গেইট দিয়ে জান্নাতের ভিতরে নেয়া হবে। যারা সব আমল করেছে- তাঁদের জন্য ১৬টি গেইট-ই খোলা থাকবে। সে যেটা দিয়ে ইচ্ছা জান্নাতে প্রবেশ করবে। এটা যেন দুনিয়ার ভি.ভি.আই.পি. গেইট। আল্লামা কুরতুবী বলেন- হযরত ওমর (রাঃ) -এর বর্ণিত হাদীসে উত্তমভাবে অযুকারীর জন্য ৮ দরজা খোলার কথা আছে- যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা- সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

ইমাম তিরমিযি আবু দাউদ ও নাছায়ী এ হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন। ইমাম কুরতুবী বলেন- বিভিন্ন সহীহ্ হাদীস পর্যালোচনা করে আমি ১৬টি সদর দরজার প্রমান পেয়েছি- যা উপরে সংখ্যা দিয়ে বর্ণনা করেছি। মোট কথা- যত প্রকারের নেক আমল আছে- সে মোতাবেক এক একটি গেইট হবে। সেজন্যই আল্লাহ্পাক সুরা যুমার -এ أَبْوَابُ বহুবচন ব্যবহার করেছেন- সংখ্যা নির্ধারিত করে বলেননি। বুঝা গেল- জান্নাতের মেইন গেইটের সংখ্যা যার যার নেক আমল অনুযায়ীই হবে। ইহাই সমস্ত হাদীসের মূল কথা। আমরা যেন বাবু মোহাম্মদ দিয়ে প্রবেশ করতে পারি- এই প্রার্থনা।

(৩) বেহেস্তের মধ্যে প্রাসাদসমূহ ও তার বাসিন্দা

জান্নাতের মধ্যে প্রাসাদ থাকবে অনেক। ঐ প্রাসাদে থাকবে অনেক বাড়ী। বাড়ীতে থাকবে অনেক ঘর। ঐ ঘর বা কামরাতে থাকবে অনেক পালঙ্ক। পালঙ্কের উপরে থাকবে অনেক বিছানা। বিছানার উপর বসা থাকবে হুর বালা। প্রত্যেক ঘরে থাকবে খাদ্যের অনেক খাঞ্চা। প্রত্যেক খাঞ্চাতে থাকবে বিভিন্ন রকমের খাদ্য।

এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) এবং ইমরান ইবনে হোসাইন (রাঃ) থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে -

(৪) জান্নাতের প্রাসাদ ও বাড়ীঘর
عن الحسین قال : سألت عمران بن حصین واباھریرۃ رضی اللّٰہ عنھما عن تفسیر ھذہ الاٰیۃ (ومساکن طیبۃ فی جنت عدن) فقالا: سألنا عنھا رسول اللّٰہ ﷺ فقال : قصر من لؤلؤۃ فی الجنۃ فی ذلک القصر سبعون دارا من یاقوتۃ حمراء فی کل دار سبعون بیتا من زہر جدۃ خضراء فی کل بیت سبعون سریرا ۔ علی کل سریر سبعون فراشا من کل لون۔ علی فراش سبعون امراۃ من الحور العین فی کل بیت سبعون مائدۃ ۔ علی کل مائدۃ سبعون لونا من الطعام۔ فیعطی اللّٰہ تبارک وتعالی من القوۃ فی غداۃ واحدۃ مایأتی علی ذلک کلہ (کتاب النصیحۃ)

অর্থঃ হযরত হাসান বসরী (রহঃ) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন- আমি হযরত ইমরান ইবনে হোছাইন এবং হযরত আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে- কালামে মজিদের সূরা তাওবাহ্র ৭২ নম্বর আয়াতের তাফসীর ব্যাখ্যা করার জন্য অনুরোধ করলে তাঁরা বল্লেন- আমরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছি। আয়াতখানা হলোঃ وَمَسَاکِنَ طَیِّبَۃً فِیْ جَنّٰتِ عَدْنٍ অর্থাৎঃ “আল্লাহ্ ঈমানদার নরনারীদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জান্নাতে আদনের মধ্যে “পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন” ঘরের।

হুযুর করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “পরিচ্ছন্ন ঘর সমূহের” ব্যাখ্যা করে বল্লেন- ঐগুলো হলো- জান্নাতের প্রাসাদসমূহ- যা লুলু পাথরের তৈরী। প্রত্যেক প্রাসাদে থাকবে লাল ইয়াকুত পাথরের তৈরী ৭০টি বাড়ী। প্রত্যেক বাড়ীতে থাকবে ৭০টি সবুজ জমরুদ পাথরের ঘর। প্রত্যেকটি ঘরে থাকবে ৭০টি পালঙ্ক। প্রত্যেক পালঙ্কে থাকবে ৭০টি বিভিন্ন রংয়ের বিছানার চাদর। প্রত্যেক চাদরে বসা থাকবে ডাগরচোখের অধিকারিনী ৭০ জন হুরবালা। আর থাকবে প্রত্যেক ঘরে ৭০টি খাদ্যের খাঞ্চা বা ট্রে। প্রত্যেক খাঞ্চায় থাকবে ৭০ রকমের সুস্বাদু খাদ্য। আল্লাহ্ তায়ালা প্রত্যেক মুমিন পুরুষকে ঐ পরিমান যৌনশক্তি দান করবেন- যাতে সে প্রত্যেক হুরের সাথে একই দিনে মিলিত হতে পারে”। (“আন্-নসিহত” গ্রন্থ সুত্রেঃ আত্ তাযকিরাহ্ পৃষ্ঠা ৫৭০)।

(৫) জান্নাতে প্রত্যেকের বালাখানা ও কামরা সংখ্যাঃ

ইবনে যায়েদ তাঁর পিতা যায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন,
عن زید قال : قال رسول اللّٰہ ﷺ انہ لیجاء للرجل واحدۃ بالقصر من اللؤلؤۃ الواحدۃ ۔ فی ذلک القصر سبعون غرفۃ فی کل غرفۃ زوجۃ من الحور العین ۔ فی کل غرفۃ سبعون بابا یدخل علیہ من کل باب رائحۃ من رائحۃ الجنۃ۔ سوی الرائحۃ التی تدخل علیہ من الباب الاخر۔ وقرا قول اللّٰہ عزوجل ( فلا تعلم نفس ما اخفی لھم من قرۃ اعین) ذکر ابن وھب (التذکرۃ صفح ۵۰۸

অর্থঃ যায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত- তিনি বলেন- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, “প্রত্যেক জান্নাতী ব্যক্তিকে একটি করে লুলু পাথরের তৈরী প্রাসাদ দেয়া হবে। ঐ প্রাসাদে ৭০টি কামরা থাকবে। প্রত্যেক কামরায় একজন করে ডাগরচোখ বিশিষ্ট হুর দেয়া হবে। প্রত্যেক কামরায় ৭০ টি জানালা থাকবে। প্রত্যেক জানালা দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন জান্নাতী সুগন্ধি আসতে থাকবে। একথা বলে নবী করীম (ﷺ) কোরআন মজিদের সূরা সিজদাহ্র ১৭ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করে শুনালেন- যার অর্থ হলো “কেউ জানেনা তাঁদের জন্য নয়ন জুড়ানো কি কি প্রতিদান ও নেয়ামত লুক্কায়িত রাখা হয়েছে”। (ইবনে ওয়াহাব সুত্রে তাযকিরাহ্ ৫০৮ পৃষ্ঠা)

(৬) চতুষ্কোন বিশিষ্ট স্বর্ণের বালাখানা হযরত ওমরের জন্য নির্ধারিত
عن برید بن الخصیب رضی اللّٰہ عنہ قال : اصبح رسول اللّٰہ فدعا بلا لا فقال : یا بلال بما سبقتنی الی الجنۃ ؟ فما دخلت الجنۃ قط الا سمعت خشخشتک امامی دخلت الجنۃ البارحۃ فسمعت خشخشتک امامی ۔ فاتیت علی قصر بربع مشرف من ذھب فقلت لمن ھذا القصر ؟ قالوا لرجل عربی ۔ فقلت انا عربی لمن ھذا القصر قالوا الرجل من قریشی ۔ قالت انا قریشی لمن ھذا القصر قالوا لرجل من امۃ محمد ۔ قلت انا محمد ۔ لمن ھذا القصر ؟ قالوا لعمر بن الخطاب ۔ فقال بلال یا رسول اللّٰہ ما اذانت قط الاصلیت رکعتین وما اصابنی حدث الاتوضأ عندہ ۔ ورایت ان اللّٰہ تعالی رکعتین ۔ فقال رسول اللّٰہ ﷺ بھما ۔ خرجہ الترمذی۔

অর্থঃ হযরত বারীদ ইবনে খাসীব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন- “একদিন সোব্হে সাদেকের সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিদ্রা থেকে উঠে হযরত বেলাল (রাঃ) কে ডাকলেন এবং এরশাদ করলেন- “হে বেলাল! কোন্ আমলের কারণে তুমি আমার পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করেছো? আমি যখন জান্নাতে প্রবেশ করলাম, তোমার পায়ের মৃদু আওয়াজ আমার সামনে শুনলাম। আমি গতরাত্রে জান্নাতে প্রবেশ করে আমার সামনে তোমার পায়ের নরম আওয়াজ শুনতে পেয়েছি”।

আর শুন, আমি স্বর্নের চতুষ্কোন বিশিষ্ট উঁচু একটি বালাখানায় গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- এই বালাখানা কার জন্য নির্মিত? ফিরিস্তারা জবাব দিলো- একজন আরবী লোকের জন্য তৈরী হয়েছে। আমি বললাম- আমিই তো আরবী। বলো- কার জন্য এটি তৈরী? তাঁরা বললো- কোরাইশ বংশের একজন লোকের জন্য। আমি বললাম- আমিই তো কোরাইশী লোক। বলো- কার জন্য এটি নির্মিত? তাঁরা বললো- না, আপনার জন্য নয়- বরং তিনি মুহাম্মদ (ﷺ) -এর একজন উম্মত। আমি বললাম- আমিই তো মুহাম্মদ (ﷺ)। আমার সে উম্মত কে? তাঁরা বললো- ওমর ইবনুল খাত্তাব” (রাঃ)।

হযরত বেলাল (রাঃ) এ কাহিনী শুনার পর হুযুরের প্রশ্নের জবাবে আরয করলেন- ইয়া রাসুলাল্লাহ্ (ﷺ)! আমার মনে হয়- আমার উক্ত মর্তবার কারণ হলো- আমি যখনই আযান দিই- তখন দু রাকআত নফল পড়ে নিই। আর যখনই আমার অযু ভঙ্গ হয়ে যায়- সাথে সাথেই অযু করে নিই। আযানের পর আমার উক্ত দু রাকাআত নফল নামায আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই পড়ি। হুযুর (ﷺ) এরশাদ করলেন- হাঁ, উক্ত দু কারণেই তোমার ঐ মর্তবা হয়েছে”। (তিরমিযি)।

ব্যাখ্যাঃ আযানের পর দু’রাকআত নফল এবং দায়েমী অযুর কারণে হযরত বেলাল (রাঃ) জান্নাতের ঐ মর্তবা পেয়েছিলেন। এখন প্রশ্ন হলো- হুযুর (ﷺ) -এর আগে আগে কেন চলার শব্দ? পিছনে হলো না কেন? আল্লামা কুরতুবীসহ হাদীস বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন- খাদেম ও সেবক হিসাবে মুনিবের আগে আগে চলাই রীতি ও নিয়ম। যেমন প্রধান মন্ত্রীর আগে আগে চলে সিকিউরিটি গার্ড ও খাদেমগণ। তাঁরা রাস্তার দুপাশের লোকদেরকে প্রধান মন্ত্রীর আগমনের ইঙ্গিত দিতে থাকে- যেন লোকেরা সম্মান প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

এই হাদীসে পরিষ্কার হয়ে গেলো- হযরত ওমর (রাঃ) -এর জন্য জান্নাতে স্বর্নের আলীশান উঁচু প্রাসাদ পূর্বেই তৈরী হয়ে আছে এবং নবীজী বাহির থেকে তা দেখে এসেছেন। শিয়া সম্প্রদায় দিনরাত ২৪ ঘন্টা হযরত ওমরের (রাঃ) উপর লা’নত বর্ষণ করে থাকে। সুতরাং শিয়া সম্প্রদায় যে বাতিল ও ভ্রান্ত বেদআতী ফের্কা- এতে কোনই সন্দেহ নেই। একদল শিয়া হযরত আবু বকর (রাঃ) কেও গালাগালি করে থাকে, তাঁকে তারা সাহাবী বলেও স্বীকার করে না। একারণে তারা কাফির। কেননা, আল্লাহ্পাক কোরআনের সূরা তাওবার ৪০ নম্বর আয়াতে তাঁকে “সাহাবী” বলে ঘোষণা করেছেন। পূর্বে এক হাদীসে বলা হয়েছে- “উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম আমলনামা হাতে আসবে হযরত ওমরের। হযরত আবু বকরকে এর পূর্বেই জান্নাতে পৌঁছিয়ে দেয়া হবে”। (দেখুন উড়ন্ত আমলনামা অধ্যায়)। এখন এই দুই সাহাবীকে একদল শিয়া সকাল সন্ধ্যায় লা’নত দিয়ে থাকে। তাই তারা কাফির ও বাতিল। (দেখুন মম রচিত শিয়া পরিচিতি)।

(৭) সূরা ইখ্লাস ১০ বার পাঠে জান্নাতের একটি প্রাসাদ
عن سعید بن المسیب یقول ای نبی اللّٰہ ﷺ قال: من قرأ سوۃ الاخلال عشر مرات بنی لہ قصر فی الجنۃ ۔ ومن قرأھا عشربن مرۃ بنی لہ قصران فی الجنۃ ومن قرأ ھا تثلثین مرۃ بنی لہ قصر فی الجنۃ ۔ فقال عمر بن الخطاب رضی اللّٰہ اذا لتکثرن قصورنا فقال رسول اللّٰہ ﷺ اللّٰہ اوسع من ذلک ۔ رواہ الدارمی

অর্থঃ তাবেয়ী হযরত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়েব (রাঃ) বলেছেন- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- “যেব্যক্তি সূরা ইখ্লাস বা কুলহুয়াল্লাহ্ ছুরা দশবার পাঠ করবে- তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ বা বালাখানা তৈরী করা হবে। বিশবার পড়লে দুটি এবং ত্রিশবার পড়লে তিনটি বালাখানা তৈরী হবে। একথা শুনে হযরত ওমর ইব্নুল খাত্তাব আরয করলেন- তাহলে তো আমাদের প্রাসাদ বা বালাখানার সংখ্যা অনেক হয়ে যাবে। নবী করীম (ﷺ) এরশাদ করলেন “আল্লাহ্ এর চেয়েও বেশী প্রশস্ত”। (দারামী শরীফ)।

(৮) জান্নাতের বিছানার ফরশ বা চাদর উঁচু হবে আকাশ ছোঁয়া
عن ابی سیعد الخدری رضی اللّٰہ عنہ عن النبی ﷺ فی قولہ تعالی ۔ وقرشی مرفوعۃ ۔ قال ارتفاعھا لکما بین السماء والارض مسیرۃ خمسماءۃ عام۔ رواہ الترمذی۔
অর্থঃ হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- “আল্লাহ্পাকের কালাম- “ওয়া ফুরুশিম মারফুআতিন” -এর অর্থ হলো- উঁচু ফরশ বা বিছানার চাদর। এর পরিমান হলো আসমান যমীনের দূরত্বের সমান (পাঁচশত বৎসরের)”। (তিরমিযি শরীফ)।

(৯) জান্নাতের درجات বা বিভাগ

হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রাঃ) বর্ণনা করেন,
عن ابی سعید الخدری رضی اللّٰہ عنہ عن النبی صلی اللّٰہ ﷺ قال ان الجنۃ مأۃ درجۃ ۔ لو ان العالمین اجتمعوا فی احداھن لو سعتھم ۔ رواہ الترمذی وقال حدیث غریب۔
অর্থঃ হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রাঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন-- “জান্নাতের দারাজাত বা বিভাগ একশটি। তার একটি বিভাগে যদি সমগ্র সৃষ্টজগত একত্রিত করা হয়- তাহলে তাও সঙ্কুলান হয়ে যাবে”। (তিরমিযি- হাদীসে গরীব সুত্রে)।

(১০) তোমরা জান্নাতুল ফিরদাউস -এর প্রার্থনা করবে
عن معاذ بن جبل رضی اللّٰہ عنہ قال سمعت رسول اللّٰہ یقول ۔ الجنۃ مأۃ درجۃ کل درجۃ منھا ما بین السماء والارض وان اعلاھا الفردوس وسطھا الفردوس ۔ وان العرش علی الفردوس ۔ منھا تفجر انھار الجنۃ ۔ فاذا سألتم اللّٰہ فاسئلوہ الفردوس ۔ رواہ الترمذی (قال الترمذی عطاء ھذا لم یدرک معاذ بن جبل )

অর্থঃ হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একথা এরশাদ করতে শুনেছি- “জান্নাতে একশত দরজা বা বিভাগ রয়েছে। এক একটি বিভাগ আসমান যমিনের মধ্যবর্তী স্থানের সমান। উম্মতের জন্য জান্নাতের মধ্যে সর্বোচ্চ ও উত্তম জান্নাত হলো ফিরদাউস। ফিরদাউসের উপরে হলো আরশে আযীম। এই জান্নাতুল ফিরদাউস থেকে বেহেস্তের চারটি নহর প্রবাহিত হয়। (পানি, দুধ, মধু ও পবিত্র শরাব)। যখনই তোমরা আল্লাহর কাছে বেহেস্ত প্রার্থনা করবে- তখন জান্নাতুল ফিরদাউস-ই প্রার্থনা করবে”। (তিরমিযি মুনকাতা সুত্রে- মুয়ায থেকে)।

ব্যাখ্যাঃ আটটি বেহেস্তের মধ্যে সর্বোচ্চ “জান্নাতুল আদন” আম্বিয়ায়ে কেরামের জন্য নির্ধারিত। বাকী ৭টির মধ্যে ফিরদাউস হলো সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম। এটি ঈমানদার ও নেক আমলধারী নিখুঁত লোকদের জন্য বরাদ্দকৃত। এই সর্বোচ্চ জান্নাত প্রার্থনা করার জন্য নবীজীর পরামর্শের কারণ হলো- নবীগণের মধ্যে তিনি হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। উম্মতের মধ্যে উম্মতে মোহাম্মদী হলো সর্বশ্রেষ্ট এবং জান্নাতের মধ্যে (“নবীগণকে বাদ দিয়ে”) জান্নাতুল ফিরদাউস হলো সর্বশ্রেষ্ঠ। সুতরাং সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত হয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ জান্নাত কামনা করাই যুক্তিসঙ্গত।

Post a Comment

0 Comments