জান্নাত ও তার নেয়ামত ১১ থেকে ১৯পর্যন্ত


জান্নাত  কয়টি....? 
জান্নাতের সংখ্যা ও নাম


জান্নাতের সংখ্যা ৮টি যথা- (ক) জান্নাতুল আদন (খ) জান্নাতুল ফিরদাউস (গ) জান্নাতুন নাঈম (ঘ) জান্নাতুল মা’ওয়া (ঙ) দারুস সালাম (চ) দারুল খুল্দ (ছ) দারুল ক্বারার (জ) দারুল...।

তন্মধ্যে সর্বোচ্চ জান্নাতুল আদন হচ্ছে আম্বিয়ায়ে কেরামের জন্য নির্ধারিত। এখানেই আল্লাহ্পাক নিজ দীদার দান করবেন। তারপর মোমেনদের জন্য সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম জান্নাত হচ্ছে জান্নাতুল ফিরদাউস। ইহা জান্নাতুল আদন সংলগ্ন। এর পরের স্থান হলো জান্নাতুল খুল্দ। এর পরের স্থান হলো জান্নাতুন নাঈম। এরপরের স্থান হলো জান্নাতুল মা’ওয়া। এর পরে দারুস সালাম। এরপরে দারুল ক্বারার। এরপরে দারুল....।


১১) কোরআনের আয়াতের সংখ্যা যত- জান্নাতের বিভাগও ততঃ

হযরত ইবনে আব্বাস ও হযরত আয়েশা (রাঃ) -এর বর্ণনা
عن عبد اللّٰہ بن عباس رضی اللّٰہ عنھما عن النبی ﷺ قال: درج الجنۃ علی عدد آی القرآن لکل آیۃ درجۃ ۔ فتلک ۔ فتلک ستۃ آلاف ومائتا اٰیۃ وستۃ عشر آیۃ ۔ بین کل درجتین مقدار ما بین السماء والارض۔ وینتھی بہ الی اعلی علیین ۔ لھا سبعون الف رکن وھی یا قوتۃ تضیئی مسیرۃ ایام ولیالی ۔

 وقالت عائشۃ رضی اللّٰہ عنھا ان عدد آی القران علی عدد درج الجنۃ فلیس احدیدخل الجنۃ ۔ افضل ممن قرأ القران ۔ وذکرہ مکی رحمۃ اللّٰہ علیہ۔ کتاب الاختیار فی الملح من الاخبار والآثار لابی حفص عمر بن عبد المجید القرشی المیانشی)
অর্থঃ হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে রেওয়ায়াত করেন- নবী করীম (ﷺ) এরশাদ করেছেন- “কোরআনের আয়াতের সমপরিমান সংখ্যা হলো জান্নাতের দরজা বা বিভাগ সমূহের। ইবনে আব্বাস বলেন- “কোরআনের আয়াত হলো ৬২১৬ (ছয় হাজার দুইশত ষোল)। দু’বিভাগের মধ্যবর্তী স্থানের দূরত্ব হলো আসমান যমীনের মধ্যবর্তীস্থান। এক একটি বিভাগ “আ’লা ইল্লিয়্যিন” এ গিয়ে শেষ হয়েছে। জান্নাতের মধ্যে খাম্বা রয়েছে সত্তর হাজার। ঐ খাম্বাগুলো ইয়াকুত পাথরের তৈরী। এর আলো কয়েকদিনের রাস্তা পর্য্যন্ত বিস্তৃত”।

হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন- “কোরআনের আয়াতের সংখ্যা হলো বেহেস্তের দরজা বা বিভাগ সমূহের সংখ্যার সমপরিমান”। জান্নাতে প্রবেশকারীদের মধ্যে কোরআন পাঠকারী বা আলেমের চেয়ে উত্তম আর অন্য কেউ হবেনা”।

(মশহুর ক্বারী মাক্কী তাঁর ফাওয়ায়েদে মাক্কিয়ায় মা আয়েশার রেওয়ায়াতটি বর্ণনা করেছেন- আবু হাফ্স ওমর ইবনে আবদুল মজিদ ক্বারশী মিয়ান্শী কর্তৃক রচিত কিতাব আল ইখ্তিবার ফিল মিল্হি মিনাল আখ্বার ওয়াল আছার গ্রন্থে”)।

ব্যাখ্যাঃ হযরত ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় দেখা যায়- কোরআনের আয়াতের সংখ্যা ৬২১৬ টি এবং জান্নাতের বিভাগও ৬২১৬ টি। কিন্তু মা আয়েশা (রাঃ)- এর বর্ণনায় সংখ্যা নেই। তাই বিষয়টি গবেষণা ও পর্যালোচনার দাবী রাখে। অন্য মশহুর রেওয়ায়াতে দেখা যায়- কোরআনের আয়াত হলো ৬৬৬৬। ইহাই মশহুর। এই দুই বিপরীত সংখ্যার সমাধান কিভাবে করা যায়?

এর জবাব হলো- হযরত ইবনে আব্বাসের বর্ণনার মধ্যে-
فتلک ستۃ الاف ومائتا اية وستة عشر
অংশটুকু নবী করীম (ﷺ) অথবা ইবনে আব্বাসের বাণী কিনা- এ নিয়ে মতভেদ আছে। কেননা, নবী করীম (ﷺ) যদি সঠিকভাবে ৬২১৬ আয়াত বলে থাকতেন- তাহলে মশহুর রেওয়ায়াতে কি করে তার খেলাফ ৬৬৬৬ বলা হলো? বুঝা গেল- অন্য কেউ হয়তো এ সংখ্যাটি হাদীসের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন এবং এটাকে ইবনে আব্বাসের উক্তি বলেছেন। আরবীতে এটাকে مندرج বা অনুপ্রবেশ বলা হয়। মশহুর বর্ণনা অনুযায়ীই আমল করা হচ্ছে। বর্তমান কোরআনের বাংলা অনুবাদে আয়াতের সংখ্যা বিভিন্ন রকম দেখা যায়। তাফসীরে রূহুল বয়ান অনুযায়ী কোরআনের আয়াতের সংখ্যা সর্বাধিক ৬২৬৫ এবং রূহুল মাআনীতে সর্বাধিক ৬২৮৯। মক্কা, মদিনা, কুফা, বসরা ও সিরিয়ার ক্বেরাত বিশেষজ্ঞদের মতে আয়াতের মোট সংখ্যার মধ্যে তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং মশহুর বর্ণনাকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ ওলামাগণ গ্রহণ করে বলেছেন- আয়াতের সংখ্যা ৬৬৬৬।

আয়াতের সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য হওয়ার কারণ হলো- বড় বড় আয়াতকে কেউ কেউ কয়েকটি আয়াত ধরেছেন- যেমন, “যালিকাল কিতাবু লা-রাইবা ফিহী, হুদাললিল মুত্তাকীন” একটি আয়াতকে কেউ কেউ তিনটি আয়াত ধরেছেন। আবার অনেকে ছোট ছোট কয়েকটি আয়াত মিলিয়ে এক আয়াত গণনা করেছেন। বর্তমানে যারা চ্যালেঞ্জ করে- তারা কিন্তু এ বিষয়ে কোন জ্ঞানই রাখেনা। পরের হিসাবে তারা হিসাব করে। অনুবাদ ও তাফসীর গ্রন্থের মধ্যে সংখ্যার পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ)- এর অত্র বর্ণনায় ক্বারীগণের যে মর্যাদা বয়ান করা হয়েছে- এর বিশ্লেষণ করে ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেছেন- এখানে ক্বারী অর্থে “হামিলুল কোরআন” তথা কোরআন বিশেষজ্ঞকে বুঝানো হয়েছে- যারা কোরআনে বর্ণিত বিধিবিধান যথাযথভাবে বুঝেন এবং সে মোতাবেক আমল করেন। তারাই জান্নাতীদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হবেন”। ১০ নম্বর হাদীসে জামাতের বিভাগ বলা হয়েছে একশত। উক্ত বর্ণনা চুড়ান্ত নয়। এরপরেও বিভাগ থাকতে পারে।

(১২) জান্নাতের غرفات বা কামরার সংখ্যা এবং বাসিন্দাদের বর্ণনা

আল্লাহ্পাক জান্নাতের কামরাসমূহ এবং তার বাসিন্দাদের সম্পর্কে সংখ্যা ছাড়াই সাধারণভাবে বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে,
لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ غُرَفٌ مِّن فَوْقِهَا غُرَفٌ مَّبْنِيَّةٌ
অর্থঃ “কিন্তু যারা তাঁদের পালনকর্তাকে ভয় করে, তাঁদের জন্য নির্মিত রয়েছে প্রাসাদের কামরার উপর কামরাসমূহ”। (সূরা যুমার ২০ আয়াত)।

অন্য আয়াতে বর্ণনা করেছেন,
إِلَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُوْلَئِكَ لَهُمْ جَزَاء الضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوا وَهُمْ فِي الْغُرُفَاتِ آمِنُونَ
অর্থঃ (তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করতে পারবে না। ) “তবে- যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাঁদের জন্য রয়েছে- তাঁদের কাজের বিনিময়ে বহুগুণ পুরষ্কার। তাঁরা কামরাসমূহে নিরাপদে থাকবে”। (সূরা সাবা ৩৭ আয়াত)।

অন্য আয়াতে আল্লাহ্ পাক বলেছেন,
أُوْلَئِكَ يُجْزَوْنَ الْغُرْفَةَ بِمَا صَبَرُوا وَيُلَقَّوْنَ فِيهَا تَحِيَّةً وَسَلَامًا
অর্থঃ “যারা বিভিন্ন সৎকাজে কষ্ট স্বীকার করেছে, তাঁদেরকে তাঁদের সবরের বিনিময়ে প্রাসাদের কামরাসমুহ দেয়া হবে এবং তাঁদেরকে দোয়া ও সালামসহ তথায় অভ্যর্থনা জানানো হবে”। (সূরা ফুরকান ৭৫ আয়াত)।

বুঝা গেল- জান্নাতে অসংখ্য কামরা হবে।

(১৩) নবী করীম (ﷺ) উক্ত আয়াত সমূহের ব্যাখ্যায় জান্নাতের প্রাসাদের কামরা সমূহের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-
عن سھل بن سعد ان رسول اللّٰہ ﷺ قال ان اھل الجنۃ لیتراء ون اھل الغرف من فوقھم کما تتراء ون الکوکب الدری الغائر فی الافق من المشرق او المغرب لتضاضل ما بینھم ۔ قالوا یا رسول اللّٰہ تلک منازل الانبیاء لا یبلغھا غیرھم؟ قال: بلی والذی نفسی بیدہ۔ رجال آمنوا باللّٰہ وصدقوا المرسلین۔

অর্থঃ হযরত সাহল ইবনে সাআদ (রাঃ) নবী করীম (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন। নবীজী (ﷺ) বলেন- “সাধারণ জান্নাতবাসীরা প্রাসাদের কামরায় বসবাসকারী বিশেষ লোকদেরকে উপরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাবে- যেভাবে তোমরা উপরের দিকে তাকিয়ে দুরবর্তী উজ্জল তারকা দেখতে পাও- সকালে বা সন্ধ্যায়। এটা এজন্য যে, কর্ম অনুযায়ী তাঁদের মধ্যে মর্তবার এই পার্থক্য হবে”।

সাহাবায়ে কেরাম একথা শুনে আরয করলেন- ইয়া রাসুলাল্লাহ্! ইহা তো মনে হয় নবীগণের শান। এই মর্যাদা তো তাঁদেরই প্রাপ্য? হুযুর (ﷺ) বললেন- হাঁ, তবে অন্যরাও পাবে। যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ করে বলছি- ঐসমস্ত লোকেরাই এ মর্তবা পাবে-যারা মনেপ্রাণে আল্লাহ্কে বিশ্বাস করেছে এবং বিনাবাক্যে নবীগণকে সত্য বলে জেনেছে”।

(হযরত সাহ্ল -এর অন্য রেওয়ায়াতে তিরমিযি শরীফে আছে- এ মর্তবাধারীদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ) রয়েছেন- মুসলিম শরীফ)।

(১৪) জান্নাতী প্রাসাদের কামরা ৪ প্রকার লোকের জন্য,
عن علی رضی اللّہ عنہ قال قال رسول اللّٰہ ﷺ ان فی الجنۃ لغرفا یری ظھورھا من بنونھا ویطونھا من ظھورھا فقام الیہ اعرابی فقال : لمن ھی یا رسول اللّٰہ، وقال لمن اطاب الکلام واطعم الطعام وادام الصیام وصلی اللّٰہ باللیل والناس نیام۔ (ترمذی)

অর্থঃ হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন- “জান্নাতের প্রাসাদ সমূহের মধ্যে অনেক অনেক কামরা আছে। উহার ভিতর থেকে বাহির দেখা যাবে এবং বাহির থেকেও ভিতর দেখা যাবে” (কাঁচের মত স্বচ্ছ)।

একথা শুনে জনৈক গ্রাম্য সাহাবী দাঁড়িয়ে আরয করলেন- কার জন্য এই কামরাসমূহ- ইয়া রাসুলাল্লাহ্? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করলেন- “চার প্রকার লোকের জন্য- যথা- (১) যারা উত্তম কথা বলে, (২) যারা খাদ্য দান করে, (৩) যারা সর্বদা নফল রোযা পালন করে এবং (৪) যারা রাত্রে আল্লাহর নামায পড়ে- যখন অন্য (ধর্মের) লোকেরা নিদ্রাবিভূত থাকে”। (তিরমিযি)।

(১৫ ক) উপরের হাদীসখানার ব্যাখ্যাস্বরূপ হযরত জাবের (রাঃ) এভাবে বর্ণনা করেছেন,
عن جابر بن عبد اللّٰہ رضی اللّٰہ عنھما قال خرج علینا رسول اللّٰہ ذات یوم فقال : الا اخبرکم بغرف الجنۃَ ؟ غرفا من الوان الجواھر یری ظاھرھا من باطنھا ۔ وباطنھا من ظاھرھا ۔ فیھا من النعیم الثواب۔ والکرامات مالا اذن سمعت ولا عین رأت ۔ فقلنا بابینا انت وامنا۔ یا رسول اللّٰہ لمن تلک؟ فقال لمن افشی السلام وادام الصیام واطعم الطعام وصلی والناس نیام ۔فقلنا بابینا انت وامنا یا رسول اللّٰہ ومن یطیق ذلک؟ فقال امتی تطیق ذلک وسأخبرکم من یطیق ذلک ۔ من لقی اخاہ السلم فسلم علیہ فقد افشی السلام۔ ومن اطعم اھلہ وعیالہ من الطعام حتی یشبعھم فقد اطعم الطعام ۔ ومن صام من رمضان ومن کل شھر ثلاثۃ ایام فد ادام الصیام ۔ ومن صلی العشاء الاخیرۃ فی جماعۃ فقد صلی والناس نیام ای الیھود والنصاری والمجوس ۔ ( ابونعیم)

অর্থঃ হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- একদিন রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে এসে উপস্থিত হয়ে এরশাদ করলেন- “আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতের প্রাসাদের কামরাগুলো সম্পর্কে কিছু জানাবো না? একটি কামরা হবে মূক্তার রংয়ের মত- যার ভেতর থেকে বাইরে দেখা যাবে এবং বাইরে থেকেও ভিতর দেখা যাবে। ঐ কামরায় থাকবে এমন সব অগনিত নেয়ামত, পুরষ্কার ও মর্যাদাপূর্ণ বস্তু- যা কারো কর্ন কোনদিন শ্রবণ করেনি এবং কোন চক্ষুও তা কোনদিন অবলোকন করেনি”।

হযরত জাবের বলেন- আমরা আরয করলাম- আমাদের পিতামাতা আপনার চরণে উৎসর্গীত হোক- হে আল্লাহর প্রিয়রাসুল! ঐ কামরাসমূহ কার জন্য নির্ধারিত? হুযুর (ﷺ) বল্লেন- চার প্রকার লোকের জন্য। যথা- (১) “যারা সালাম প্রথার প্রসার ঘটায়, (২) যারা সর্বদা রোযা রাখে, (৩) যারা খাদ্যদান করে এবং (৪) যারা নামায আদায় করে- যখন অন্য (ধর্মের) মানুষ ঘুমন্ত থাকে”।

আমরা পুনরায় আরয করলাম- আমাদের পিতামাতা আপনার চরনে উৎসর্গ করতে আমরা প্রস্তুত- হে আল্লাহর প্রিয়রাসুল! আমাদের মধ্যে এমন সাধ্য কার আছে? হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করলেন- আমার প্রত্যেক উম্মতেরই এই সাধ্য আছে। এখন আমি তোমাদেরকে আমার কথার ব্যাখ্যা করে বলছি (১) যারা আপন মুসলমান ভাইয়ের সাথে মোলাকাত হলে ছালাম বিনিময় করে- তারাই সালাম সম্প্রসারিত করে। (২) যারা আপন সন্তান-সন্ততি ও পরিবারস্থ লোকদেরকে তৃপ্তি সহকারে খাদ্য খাওয়ায়- তারাই খাদ্যদানকারী বলে গণ্য। (৩) যারা রমযানের রোযাসহ প্রতিমাসে তিন দিনের (আইয়ামে বীজের রোযা) নফল রোযা পালন করে, তারাই জীবনব্যাপী রোযাদার বলে গণ্য। (৪) আর- যারা মানুষের (ইয়াহুদ, নাছারাও অগ্নিপূজক) নিদ্রাবস্থায় এশার নামায জামাতে আদায় করে- তারাই সদা নামাযী বলে গণ্য”।

ঘুমন্ত মানুষ বলতে- ইহুদী, নাসারা ও মজুসীদের বুঝানো হয়েছে। কেননা, মুসলমান তো এমনিতেই জাগ্রত থেকে নামায আদায় করে। (আবু নোয়াঈম)।

ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে সাহাবায়ে কেরামের বিনয়, ভক্তি ও নবী প্রেমের উজ্জ্বল প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁরা সবসময় নবীজীর চরণে পিতামাতাকে কোরবান দিতে প্রস্তুত ছিলেন। জান্নাতের একটি কাম্রা পাওয়ার আশায় তাঁরা ছিলেন ব্যাকুল। নবী করীম (ﷺ) প্রথমে যেভাবে কথা বলেছেন- তাতে মনে হয়েছিল- উক্ত চারটি কাজ খুবই কঠিন। কিন্তু নবীজী নিজেই ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিলেন- চারটি কাজের অর্থ কী।

হুযুর (ﷺ) -এর সবকথা যেখানে সাহাবীগণ অনুধাবন করতে অক্ষম- সেখানে আমরা কে? এজন্যই হাদীসের মর্ম বুঝার জন্য মাযহাবের বিজ্ঞ ইমামগণের প্রয়োজন হয়। তাঁদের ব্যাখ্যা ছাড়া নিজে নিজে কেউই বুঝতে পারবে না। একশ্রেণীর জাহেল লোক হাদীসের অনুবাদ পড়েই মাছআলা দেয়া শুরু করে দেয়। এরা মাযহাব মানেনা, ইমামদের ব্যাখ্যা মানেনা। এরা আহ্লে হাদীস বলে দাবী করে- অথচ একটি হাদীসের ব্যাখ্যা করার ক্ষমতাও এদের নেই। বর্তমানকালে জামাতী, তাবলীগী, আহ্লে হাদীস, লা-মাযহাবী লোকেরা কথায় কথায় হাদীসের উল্টাপাল্টা মর্ম বুঝায়। ইহা কোন্ ইমামের ব্যাখ্যা- তা তারা বলে না। আল্লাহ্ এদের খপপর থেকে মাযহাবপন্থী মুসলমানকে রক্ষা করুন। আমীন!

(১৫ খ) প্রাসাদের কিছু কিছু কাম্রা থাকবে শুন্যে ভাসমান
عن انس بن مالک رضی اللّٰہ عنہ قال قال رسول اللّٰہ ﷺ ان فی فی الجنۃ لغرفا لیس لھا مغالیق من فوقھا ولا عماد من تحتھا قیل یا رسول اللّٰہ وکیف یدخلھا اھلھا ؟ قال یدخلونھا اشباہ الطیر ۔ قیل ھی یا رسول اللّٰہ لمن ؟ قال سول الاھل الاسقام ۔ والاوجاع والبلوی ۔(التذکرۃ صفح ۵۰۷)

অর্থঃ হযরত আনাছ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন- রাসুলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, “নিশ্চয়ই জান্নাতের প্রাসাদ সমূহে এমন অনেক কাম্রা রয়েছে- যেগুলো শুন্যের উপর ভাসমান- উপরের দিকে কোন তালা নেই এবং নীচেও কোন খুটি নেই”। সাহাবীগণ আরয করলেন- ইয়া রাসুলাল্লাহ! তাহলে ঐ কামরাবাসীরা কেমন করে প্রবেশ করবে? হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করলেন- তারা পাখীর ন্যায় উড়ে ঢুক্বে। পুনরায় আরয করা হলো- “ঐ কামরাগুলো কার জন্য নির্ধারিত”? হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করলেন- “ঐগুলো রোগী, ক্ষুর্ধাত ও বিপদগ্রস্ত লোকদের জন্য”। (আত্-তাযকিরাহ্ পৃষ্ঠা ৫০৭)।

(১৬) জান্নাতের তাবু হবে মুক্তার তৈরী
عن ابی موسی الاشعری ان رسول اللّٰہ ﷺ قال فی الجنۃ خیمۃ من لؤلؤۃ غرفۃ ۔ عضھا ستون میلا فی کل زاوی منھا اھل للمومن م یرون الاٰخرین یطوف علیھم المؤمن ۔ رواہ مسلم وفی روایۃ الخیمۃ درۃ ۔ طوالھا فی السماء ستون میلا۔ فی کل زاریۃ۔ منھا اھل المؤمن ما یرون الاٰخرین۔

অর্থঃ হযরত আবু মুছা আশ্আরী (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ রাসুলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-“ জান্নাতের প্রাসাদে থাকবে লুলু পাথরের প্রশস্ত তাবুসমূহ। এক একটি তাবুর প্রস্থ হবে ৬০ মাইল। ঐ তাবুর চতুর্পার্শ্বের প্রতি কোনায় থাকবে মোমিনদের পরিবার পরিজন- যাদের একজন অন্যদেরকে দেখতে পাবে। মুমিনরা ঐসব স্ত্রীদের সাথে মিলিত হবে তথায়”। (মুসলিম শরীফ)।

অন্য বর্ণনায় এসেছে- তাঁবুগুলো হবে মুক্তার তৈরী। তাঁর উচ্চতা হবে আসমান ছোঁয়া। প্রস্থ হবে ৬০ মাইল। প্রত্যেক পাশে থাকবে মোমেনদের পরিবার পরিজন- যাদের একজন অন্যদেরকে দেখতে পাবে”। (তাযকিরাহ্)।

(১৭) জান্নাতে সাপ্তাহিক প্রদর্শনী বাজার বসবে
عن انس بن مالک رضی اللّٰہ عنہ ان رسول اللّٰہﷺ قال ان فی الجنۃ لسوقا یأتونھا کل جمعۃ ۔ فتھب ریح الشمال فتحثوا فی وجوھھم وثیابھم المسک ۔ فیزدادون حسنا وجمالا ۔ فیرجعون الی اھلھم وقد ازداروا ۔ حسنا جمالا۔ فیقول لھم اھلھم واللّٰہ لقد ازددتم حسنا وجمالا ۔ رواہ مسلم۔

অর্থঃ হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- “নিশ্চয়ই জান্নাতে থাকবে বাজারসমূহ। জান্নাতীরা প্রতি শুত্রবারে ঐ বাজারে একত্রিত হবে। উত্তরের শীতলবায়ু বয়ে যাবে। এতে তাদের চেহারা ও পোষাকে মিশ্ক সুগন্ধি ছড়াবে। আর তাদের সৌষ্ঠব তাঁদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে বহুগুনে। যখন তাঁরা রূপসৌন্দর্য নিয়ে আপন পরিবারে ফিরে আসবে- তখন তারাও বলবে- খোদার কসম, তোমাদের রূপসৌন্দর্য তো আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে”। (মুসলিম শরীফ)।

ব্যাখ্যাঃ হযরত আলী ও হযরত আনাছ (রাঃ) বলেন- দুনিয়ার মত জান্নাতের বাজার বেচা কেনার বাজার নয়- বরং রূপসৌন্দর্য বৃদ্ধির পরিচর্যাগৃহ। সেখানে প্রতি শুক্রবার একবার করে রূপচর্চা হবে। দুনিয়ার মত সাজানী নয়- বরং প্রাকৃতিকভাবে উত্তরা হাওয়ায় মিশক ভেসে আসবে, চেহারা ও পোষাক সুগন্ধময় করে তুলবে এবং চেহারার রূপসৌন্দর্য বহুগণ বৃদ্ধি করে দিবে। (কল্পনার জন্য আধুনিক রূপচর্চা গৃহ ধারণা করা যেতে পারে। রূপসৌন্দর্য জান্নাতী তোহ্ফা স্বরূপ। এর জন্য সাধনা করা প্রয়োজন। অলস হয়ে বসে থাকলে চলবেনা)।

উল্লেখ্যঃ জান্নাতে প্রবেশাধিকার হবে ঈমানের বিনিময়ে- কিন্তু মানাযিল বা মর্তবাসমূহ পাবে আমলের বিনিময়ে। এটাই ওলামায়ে কেরামের মতামত (আত-তাযকিরাহ্ ও মাওয়াহিব ৬৭৯ পৃষ্ঠা)। নবীর প্রেম ও ভালবাসায় পাওয়া যাবে নবীজীর সান্নিধ্য। সাহাবী রাবিয়া (রাঃ) নবীজীর সান্নিধ্য চেয়েছিলেন। নবীজী তা মঞ্জুর করেছেন। আল্লাহর ইবাদত ও নবীজীর মহব্বৎ হলো সকল মর্যাদার চাবি কাঠি।

(১৮) গরীব মুসলমানগণ ধনীদের পাঁচশত বৎসর পূর্বে জান্নাতে যাবে
عن ابی الدرداء رضی اللّٰہ عنہ قال حدثنی عمر بن الخطاب قال سمعت رسول اللّٰہ ﷺ یقول انی فقراء المسلمین یدخلون الجنۃ قبل الاغنیاء بنصف یوم ۔ قیل لہ یا رسول اللّٰہ وما نصف یوم؟ قال خمسمأۃ سنۃ قیل لہ فکم السنۃ من شھر قال خمسمأۃ شھر ۔ قیل لہ فکم الشھر من یوم ۔ قال خمسمأۃ یوم قیل لہ فکم الیوم قال خمسمأۃ مما تعدون ۔ (ذکرہ العتبی فی عیون الاخبار ۔ التذکرۃ للقرطبی صفح ۵۱۲)

অর্থঃ হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন- হযরত ওমর (রাঃ) আমাকে একটি হাদীস শুনিয়েছেন। তাহলো- তিনি শুনেছেন- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- “গরীব ও হত-দরিদ্র মুসলমানরা ধনী লোকদের অর্ধদিবস পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। আরয করা হলো- ইয়া রাসুলাল্লাহ্! অর্ধদিবস বলতে কি বুঝায়? হুযুর (ﷺ) বল্লেন- “পরকালের অর্ধদিবস হলো দুনিয়ার পাঁচশত বৎসরের সমান”। আবার আরয করা হলো- কতমাসে এক বৎসর হবে? হুযুর (ﷺ) বল্লেন- “পাচশত মাসে এক বৎসর”। আবার আরয করা হলো- কতদিনে একমাস? হুযুর (ﷺ) বল্লেন- “পাঁচশত দিনে একমাস”। পুনরায় প্রশ্ন করা হলো- একদিন কতদিনের সমান? হুযুর (ﷺ) বললেন- “একদিন পাঁচশত দিনের সমান”। (উৎবী কৃত উয়ুনুল আখ্বার সূত্রে- কুরতুবীর তাযকিরাহ্ পৃষ্ঠা ৫১২)।

ব্যাখ্যাঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কত সুন্দর করে পরজগতের হিসাব তুলে ধরলেন এ হাদীসের মাধ্যমে। দুনিয়ার পাঁচশত বৎসরের সমান ওখানকার অর্ধদিন। দুনিয়ার এক হাজার বছরের সমান হবে হাশরের একদিন। কিন্তু আরশে মোয়াল্লার একদিন হলো দুনিয়ার পঞ্চাশ হাজার বৎসরের সমান।

(১৯) মক্কার মুহাজির মুসলমানগণ ধনীগণের পাঁচশত বৎসর পূর্বে জান্নাতে যাবেন,
عن ابی سعید الخدری رضی اللّٰہ عنہ قال قال رسول اللّٰہ ﷺ فقراء المھاجرین یدخلون الجنۃ قبل اغنیاءھم بخمسمأۃ عام ۔ خرجہ الترمذی۔
۴۱ نمبر
অর্থঃ হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রাঃ) বর্ণনা করেন- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন - মক্কার মুহাজির মুসলমানগণ তাঁদের ধনীদের চেয়ে পাঁচশত বৎসর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। (তিরমিযি শরীফ)।

ব্যাখ্যাঃ হযরত আবু দারদা বর্নিত পূর্ব হাদীসে হুযুর (ﷺ) সাধারণ গরীব মুসলমানের জান্নাতে প্রবেশের সময় বলেছেন- ধনীদের পাঁচশত বৎসর পূর্বে। আর হযরত আবু সায়ীদ খুদরী বর্ণিত বর্তমান হাদীসে দেখা যায়- মক্কার মুহাজির দরিদ্রগণও জান্নাতে যাবেন তাঁদের মধ্যকার ধনীগণের পাঁচশত বৎসর পূর্বে।

বাহ্যিক দৃষ্টিতে দুটি বর্ণনা বিপরীতমুখী মনে হলেও মূলতঃ কোন বিরোধ নেই। কেননা, মুহাজির গরীব ও মুহাজির ধনীদের মধ্যে তুলনা করা হয়েছে পাঁচশত বৎসরের ব্যবধান। আর সাধারণ মুসলমান গরীব ও ধনীদের মধ্যেও তুলনা করা হয়েছে পাঁচশত বৎসরের ব্যবধান। সুতরাং প্রত্যেক যুগের ধনী দরিদ্রের মধ্যে এই ব্যবধান থাকবে। তাহলে সরল অর্থ দাড়ায় এই -“প্রত্যেক যুগের গরীবগণ সে যুগের ধনীদের চেয়ে পাঁচশত বৎসর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবে”।

অত্র হাদীসে গরীবদের জন্য শুভ সংবাদ দেয়া হয়েছে- যাতে গরীবগণ অধৈর্য না হয়ে আল্লাহর উপর আস্থা রাখে। আল্লাহ্ তাদের ধৈর্যের বিনিময়ে কম হিসাব নিকাশে ৫০০ বৎসর পূর্বেই জান্নাতের নেয়ামত দান করবেন। এ হাদীসের অর্থ এ নয় যে, গরীবরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে, কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে তাক্বদীরের উপর ভরসা করে বসে থাকবে- বরং চেষ্টা তাদবীরের পরও যাদের দারিদ্র দূর করা সম্ভব হয় না- তারা যেন অধৈর্য না হয়ে তাকদীর মেনে নেয়। তাহলেই আল্লাহ্পাক পরকালে তাদের জন্য উক্ত পুরষ্কার দিবেন। দুনিয়ায় কষ্ট পেলেও পরকালে সুখ পাবে এবং ধনীদের পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবে। জান্নাতের নেয়ামত পেলে দুনিয়ার কষ্ট তখন ভুলে যাবে। সুতরাং গরীবরা ভাগ্যবান।



Post a Comment

0 Comments